উপকূলের লবণাক্ততা ধান‑ফসল ও চিংড়ি চাষে সংকট সৃষ্টি
উপকূলের লবণাক্ততা ধান‑ফসল ও চিংড়ি চাষে সংকট সৃষ্টি
খুলনা জেলার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শুধু বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা নদীভাঙনেই সীমাবদ্ধ নয়; লবণাক্ততা বৃদ্ধি ধান উৎপাদন ও চিংড়ি চাষ উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলেছে।
পাইকগাছা উপজেলার মাহমুদকাঠির এক বিঘা জমিতে ধান চাষকারী সাইদ মোড়ল জানান, লবণাক্ততা বাড়ার ফলে খরচ ৮-১০ হাজার টাকা হলেও ফলন মাত্র ১৬ মণ, যা দশ বছর আগে ১৮-২০ মণ থেকে কমে গেছে। ২০১৫ সালে কপোতাক্ষ নদের বাঁধ ভেঙে জমি প্লাবিত হওয়া থেকে সমস্যার তীব্রতা বেড়েছে।
একই উপজেলার কলাবাগানমালিক আবদুল কাদের মোড়লও বলেন, আগে লবণাক্ততা না থাকায় সব ধরনের ফসল হতো, এখন লবণজনিত সমস্যায় কলা গাছও ভালভাবে বাড়ছে না।
লবণাক্ততার প্রভাব শুধুমাত্র ফসলের ফলন নয়, মাটির উৎপাদনক্ষমতাকেও ক্ষয় করছে। ২০০৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার মাটি ও নদীর পানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বাড়ে, বর্ষায় বৃষ্টিপাত ও মিঠা পানির প্রবাহে তা কমে। ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি ঢুকলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়।
স্থানীয় কৃষক ইউনুস গাজী (পাইকগাছা) জানান, তার আট বিঘা জমিতে বছরে সাত‑আট মাস লবণাক্ত পানি থাকে, ফলে ধান চাষ সম্ভব নয়; তিনি বাধ্য হয়ে বাগদা চিংড়ি চাষে লিপ্ত হয়েছেন। শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান চাষের জন্য লবণাক্ত পানি সরিয়ে মিঠা পানি আনতে খরচ বাড়ে, আর চিংড়ি চাষে বিঘা প্রতি ২০‑৩০ হাজার টাকা ব্যয় সত্ত্বেও আয় মাত্র ৩০ হাজার টাকা, অতিরিক্ত লবণাক্ততা চিংড়ির মৃত্যুও ঘটায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালে ১০.৫৬ লক্ষ হেক্টর চাষযোগ্য জমি লবণাক্ত ছিল; ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ১১.৫৬ লক্ষ হেক্টরে পৌঁছেছে, অর্থাৎ ৬৭.৯% জমি লবণাক্ত হিসেবে চিহ্নিত। গড়ে বছরে মাটির লবণাক্ততা ১৭৬ µS/cm এবং নদীর পানির লবণাক্ততা ৯৩ µS/cm হ্রাসের প্রবণতা রয়েছে, তবে খুলনা কৃষ্ণনগরে ২০১৪‑২০২২ সালে পুনরায় বৃদ্ধি দেখা যায়।
অন্যদিকে, যেখানে মিঠা পানির সঞ্চয় ও সেচের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে কৃষকেরা ধান, পাট, সরিষা, শীতকালীন সবজি ইত্যাদি ফসলের মাধ্যমে ভালো ফলন পাচ্ছেন। হেতামপুরের আবদুস সালাম চার বিঘা মিঠা পানির জমিতে বছরে চার ফসল কাটছেন, ধানের ফলন ১৬‑১৮ মণ এবং সরিষা ৫‑৬ মণ।
স্থানীয় গবেষণা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলার প্রায় ৫৭% আবাদি জমি শুষ্ক মৌসুমে মাঝারি থেকে তীব্র লবণাক্ততার শিকার, আর ৪৩% জমিতে মিঠা পানির ভিত্তিতে কৃষি সম্ভব। আধুনিক ড্রিপ সেচ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, লবণ‑সহিষ্ণু ফসলের জাত ও মাটিতে জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করা এখনই টেকসই অভিযোজনের মূল চাবিকাঠি।
লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত চাপে উপকূলীয় কৃষি‑মৎস্যের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তবে সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা, গবেষণাভিত্তিক ফসল নির্বাচন এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা দিয়ে এই সংকটকে মোকাবেলা করা সম্ভব।
মতামত