শাশুড়ি‑পুত্রবধূ সম্পর্কের ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি: সম্মান ও ন্যায়ের নতুন দৃষ্টান্ত
শাশুড়ি‑পুত্রবধূ সম্পর্কের ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি: সম্মান ও ন্যায়ের নতুন দৃষ্টান্ত
শাশুড়ি ও পুত্রবধূর সম্পর্ককে প্রায়ই সংঘাতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তবে ইসলাম এই বন্ধনকে পারস্পরিক সম্মান, মমতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে নির্দেশ দেয়।
বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের বহু পরিবারে শাশুড়ি‑পুত্রবধূর টানাপোড়েন দাম্পত্য জীবনে অশান্তি ও কলহের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে বিয়ের পর পুত্রবধূকে শাশুড়ির সেবা‑যত্ন করা ফরজ বা ওয়াজিব বলে ধরা হয়, যদিও ফিকহে এ বিষয়ে কোনো একপক্ষীয় বাধ্যবাধকতা নেই।
ইসলামিক শাসন অনুযায়ী, স্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব হল স্বামীর আনুগত্য ও সন্তান লালন‑পালন করা। শাশুড়ি‑শ্বশুরকে আইনগতভাবে তার সেবা করতে বাধ্য করার কোনো অধিকার স্বামীর নেই। তবে, যদি কোনো মুসলিম নারী স্বেচ্ছায়, ভালোবাসা ও সম্মানের ভিত্তিতে শাশুড়ির সেবা করে, তা পুণ্যের কাজ এবং উত্তম চরিত্রের নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত (আল‑ফতোয়া আল‑হিন্দিয়া, ১/৫৫৬)।
শাশুড়ির মূল দায়িত্ব হল পুত্রবধূকে নিজের কন্যার মতো গ্রহণ করা, তার ভুলত্রুটি মমতার সঙ্গে শুধরে দেওয়া এবং মানসিক জুলুম থেকে বিরত থাকা। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়" (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ১৯১৯)।
শাশুড়ি যদি পুত্রবধূকে মায়ের মতো স্নেহে রাখেন, তবে স্বাভাবিকভাবেই পুত্রবধূর হৃদয়ে শাশুড়ির প্রতি শ্রদ্ধা জন্ম নেবে। একই সময়ে, শাশুড়ি যদি ক্ষমতার লড়াইয়ের মনোভাব নিয়ে আচরণ করেন, তবে তা ইসলামের ন্যায়বিচার নীতির বিরোধী।
শাশুড়ি‑পুত্রবধূর টানাপোড়েনে স্বামী সবচেয়ে সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করেন। ইসলাম স্বামীকে নির্দেশ দেয় উভয়ের প্রতি সমান ন্যায়বিচার করতে, কোনো একপক্ষের অবাধ্যতা বা অন্যায়কে সহ্য না করতে। যদি ঘরে ক্রমাগত ঝগড়া হয় এবং সমাধান না হয়, তবে স্ত্রীর সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে আলাদা বাসস্থানের দাবি করার। স্বামীর আইনগত দায়িত্ব হল স্ত্রীর জন্য নিরাপদ, বাধামুক্ত ও গোপনীয়তা রক্ষাকারী বাসস্থান নিশ্চিত করা, যাতে শাশুড়ি‑শ্বশুরের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ না হয় (আল‑ফতোয়া আল‑হিন্দিয়া, ১/৫৫৬)।
এই অধিকারকে সমাজে কখনো কখনো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হলেও, ইসলাম এটিকে পারিবারিক কলহ রোধে যুগান্তকারী সমাধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পরিবারকে শান্তির নীড়ে রূপান্তরিত করতে গিবত, কানকথা ও ছোট বিষয়কে বড় করে তোলার মানসিকতা পরিহার করা জরুরি। রাসুল (সা.) আরেকটি হাদিসে বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম" (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)।
অবশেষে শাশুড়ি ও পুত্রবধূ উভয়কে বুঝতে হবে, তাদের সম্পর্ক ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হবে। শাশুড়ি যদি পুত্রবধূর কাছ থেকে সেবা ও সম্মান চান, তবে তাকে অভিভাবকসুলভ ভালোবাসা ও উদারতা প্রদর্শন করতে হবে; তেমনি পুত্রবধূকেও শাশুড়ির প্রতি বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
মতামত