অসুস্থ হলে চিকিৎসা না নেওয়া: ইসলামে কি পাপ?
অসুস্থ হলে চিকিৎসা না নেওয়া: ইসলামে কি পাপ?
ইসলামে রোগে চিকিৎসা না নেওয়া পাপ কি, তা নিয়ে বহু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। ধর্মীয় গ্রন্থ, হাদিস এবং আলেমদের মতামত একত্রে বিশ্লেষণ করে আজকের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে কখন ওষুধ গ্রহণ বাধ্যতামূলক এবং কখন তা ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয়।
নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজে অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেন এবং সাহাবিদেরও চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করেন। তিরমিজিতে বর্ণিত হাদিসে (হাদিস নং ২০৩৮) তিনি বলেন, “আল্লাহ রোগ সৃষ্টি করেনি এমন কোনো রোগের জন্য যার প্রতিষেধক না থাকে; তাই তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো।” এই উক্তি তাওয়াক্কুলের (আল্লাহর ওপর ভরসা) প্রকৃত অর্থকে পরিষ্কার করে—আল্লাহর ইচ্ছা সাপেক্ষে জগতের উপায় ব্যবহার করা।
ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়া তার "জাদুল মাআদ" গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ক্ষুধা মেটাতে খাবার ও তৃষ্ণা নিবারণে পানি পান করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; তেমনি রোগমুক্তির জন্য ওষুধ গ্রহণও তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়। উপায় না গ্রহণ করে বসে থাকা ইসলামি দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
শাস্ত্রবিশারদের মতে, রোগের তীব্রতা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করে পাপের প্রশ্নের উত্তর। সাধারণ জ্বর, সর্দি বা মাথাব্যথার মতো স্বল্পমেয়াদী অসুস্থতায় রোগী ইচ্ছা করলে ওষুধ না খেয়ে ধৈর্য ধরতে পারেন; এতে কোনো পাপ নেই। তবে প্রাণঘাতী রোগে, যখন চিকিৎসা না করলে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে, তখন চিকিৎসা গ্রহণ করা ‘ওয়াজিব’ (বাধ্যতামূলক) হয়ে যায়।
যদি কেউ জেদ করে ওষুধ না খায় এবং তার ফলে মৃত্যু হয়, তা আত্মহত্যার সমতুল্য বলে বিবেচিত হয়। কোরআনের সুরা আল-বাকারাহ (আয়াত ১৯৫) ও সুরা আন-নিসা (আয়াত ২৯) এ আল্লাহ নিজেকে ধ্বংসের পথে না যাওয়ার নির্দেশ দেন, যা ‘হিফজুন নাফস’ (জীবন রক্ষা) শারিয়াহের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ইমাম নববি (রহ.) তার "আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব" গ্রন্থে উল্লেখ করেন, যদি রোগের কারণে জীবননাশের আশঙ্কা থাকে এবং চিকিৎসা নিলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে অধিকাংশ আলেমের মতে ওষুধ গ্রহণ ফরজ।
ওষুধের হালাল-হারাম বিষয়েও ইসলাম সতর্ক করে। নবী (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ রোগ ও ওষুধ দুটোই অবতীর্ণ করেছেন, তাই চিকিৎসা নাও, তবে হারাম বস্তু দ্বারা না করো।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৮৭৪)। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে, হালাল বিকল্প না থাকলে, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সামান্য হারাম উপাদান ব্যবহার করা অনুমোদিত।
সারসংক্ষেপে, ইসলামে রোগে চিকিৎসা না নেওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাপ নয়; তা রোগের প্রকৃতি, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা এবং হালাল-হারাম মানদণ্ডের ওপর নির্ভর করে। তাওয়াক্কুলের সঠিক অর্থ হল আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে জগতের উপায়গুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা।
মতামত