পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে দেবে নতুন শ্বাস
প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬
সরকারের মাস্টার প্রকল্প পদ্মা ব্যারাজ দেশের দক্ষিণ‑পশ্চিমাঞ্চলের পানি‑সংকট, বন্যা এবং লবণাক্ততা সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে চলেছে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ, বর্ষাকালে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মাটির লবণাক্ততা হ্রাসের মাধ্যমে কৃষি, মাছধরা ও মানবিক জীবনের ওপর ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পদ্মা ব্যারাজের অধীনে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল বাঁধ, ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট, ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ, দুটি ফিশ পাস, নৌ‑লক, গাইড‑বাঁধ এবং অ্যাপ্রোচ‑বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। মোট ২,৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ এবং ১১৩ মেগাওয়াট জ্বালানি উৎপাদনের ব্যবস্থা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত।
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানান, ব্যারাজের পূর্ণ বাস্তবায়নে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলায় ১২০টি উপজেলায় প্রায় ৭ কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, বছরে মাছের উৎপাদন আড়াই লাখ টন বৃদ্ধি পাবে এবং মোট আর্থিক সুবিধা ৭,১২৭ কোটি টাকার অনুমান করা হয়েছে।
ইতিহাসিকভাবে, ১৯৭০‑এর দশকে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর প্রবাহ হ্রাস পায়, ফলে দক্ষিণ‑পশ্চিমাঞ্চল মরুকরণ ও লবণাক্ততা সমস্যায় ভুগছে। হ্রাসপ্রাপ্ত নদী প্রবাহের ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও বন্যা, এবং মাটিতে লবণ জমা হওয়া পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ব্যারাজের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা রক্ষা, নিয়মিত ড্রেজিং এবং তীর সংরক্ষণ বাঁধের নির্মাণে নদীভাঙনের হার ৩০‑৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, লবণাক্ততার কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানীয় জলের সংকট বাড়বে, আর ব্যারাজ এই সংকট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের আর্থিক ব্যয় প্রাথমিকভাবে ৩৪,৪৯৭ কোটি টাকা অনুমোদিত হয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে হবে। দ্বিতীয় ধাপে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে; নির্মাণ কাজ জুলাই ২০২৪ থেকে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার পরিকল্পনা।
পদ্মা ব্যারাজের সম্পূর্ণতা কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী সহ ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করবে। এছাড়া গঙ্গা‑কপোতাক্ষ (জি‑কে) সেচ প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে দক্ষিণ‑পশ্চিম, মধ্য‑পশ্চিম ও উত্তর‑পশ্চিমাঞ্চলে সেচের পরিধি বাড়ানো হবে।
সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম উল্লেখ করেন, ফারাক্কা বাঁধের ফলে দেশের এক তৃতীয়াংশ ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; পদ্মা ব্যারাজ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তিনি যোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রকল্পটি দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে এবং অদূর ভবিষ্যতে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
সারসংক্ষেপে, পদ্মা ব্যারাজ শুধু পানির সংরক্ষণই নয়, বরং কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মাছধরা, নৌ‑পরিবহন এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে একাধিক সুবিধা এনে দেবে। সরকার যদি প্রকল্পের পরিবেশগত দিকগুলো সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করে, তবে দক্ষিণ‑পশ্চিমাঞ্চল সত্যিই স্বর্ণযুগে প্রবেশ করতে পারে।
মতামত