৮০০ পর্যটক সেন্টমার্টিনের পথে: মৌসুমের প্রথম জাহাজ চালু
দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর কক্সবাজার‑সেন্টমার্টিন নৌপথে মৌসুমের প্রথম পর্যটকবাহী জাহাজ চালু হয়েছে, ৮০০‑এর বেশি যাত্রী সঙ্গে দ্বীপে রওনা হয়েছে। এতে পর্যটন সংস্থার মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং প্রথমবারের মতো দ্বীপে যাওয়া পর্যটকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে এমভি বার আউলিয়া ৮০০‑এর বেশি যাত্রী নিয়ে সেন্টমার্টিনের পথে রওনা হয়। ভোর ৬টায় ঘাটে পর্যটকরা জমা হতে থাকে, যাত্রা শুরু হওয়ার আগে টিকিট কাটার কাজ সম্পন্ন হয়।
যাত্রা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তারা একত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ নির্দেশনা কার্যকর করেন। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও সাউন্ডবক্স জাহাজে নিতে নিষেধ করা হয়; কোস্ট গার্ডের মাইক্রোফোনে পর্যটকদের সচেতনতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা করা হয়।
সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, "আজ ৮০০‑এর বেশি যাত্রী নিয়ে এ মৌসুমের প্রথম জাহাজ চলেছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞার অবসান নির্দেশ করে।" তিনি জাহাজ মালিকদের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জোর দিয়ে বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য পর্যটকদের নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে চলা বাধ্যতামূলক। কেয়াবনে প্রবেশ, ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়া, পার্টি ও উচ্চ শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ, এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজ করা যাবে না।
পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম জানান, প্রথম দিন প্রায় ৮০০ টিকিট বিক্রি হয়েছে, যা জাহাজের মোট ধারণক্ষমতার এক-চতুর্থাংশের সমান। টিকিট বিক্রির পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ নির্দেশনা এবং প্লাস্টিক ও সাউন্ডবক্স বহন না করার ব্যাপারে পর্যটকদের সচেতন করা হয়েছে।
প্রথমবার সেন্টমার্টিনে যাওয়া পর্যটক পপি সাবরিন জেসি আনন্দের সঙ্গে বলেন, "আগে কখনো সেন্টমার্টিনে যাইনি, এবার প্রথমবারের মতো দ্বীপে যাচ্ছি। মৌসুমের প্রথম দিন হওয়ায় উত্তেজনা আরও বেশি। আমি অফিসারদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গাইড হিসেবেও যাচ্ছি।"
অন্যদিকে কিছু পর্যটক টিকিটের দাম ও ভোগান্তি নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। ঢাকা থেকে আসা পর্যটক হৃদয় জানান, "অনলাইনে টিকিট কাটার পরেও অতিরিক্ত ভোগান্তি হচ্ছে। সর্বনিম্ন টিকিটের দাম এখন ৪,২০০ টাকা, যা পূর্বের ৩,৫০০ টাকার তুলনায় ৭০০ টাকা বেড়েছে। সবকিছুই দামী হয়ে যাচ্ছে, এতে আমরা মর্মাহত।"
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. এস এম মোজাম্মেল হোসেন সেন্টমার্টিনের পরিবেশগত গুরুত্ব তুলে ধরে সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সকল সংশ্লিষ্টের দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।
স্কোয়াব সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সেন্টমার্টিন রুটে তিনটি জাহাজ অনুমোদিত – এমভি বার আউলিয়া (ধারণক্ষমতা ৮৫০), এমভি কর্ণফুলি (৭৩২) এবং এমভি টেকনাফ (৭১৬)। মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা ২,২৯৮ জন।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, এমভি বার আউলিয়া সকাল ৭টায়, এমভি কর্ণফুলি সকাল ৭:১৫ টায় এবং এমভি টেকনাফ সকাল ৮:১৫ টায় নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে রওনা হবে। ফিরে আসার সময় জাহাজগুলো যথাক্রমে দুপুর ২:১৫, দুপুর ২:৩০ এবং বিকেল ৩:৩০ টায় সেন্টমার্টিন ঘাট ছাড়বে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই সময়ে দ্বীপে সর্বোচ্চ ৩,৫০০ পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা করা হবে, এবং প্রতিটি পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক, এবং দিনে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩,০০০ পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও বিক্রি, এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ কোনো ক্ষতিকর কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় পর্যটন সংক্রান্ত ব্যক্তিরা সেন্টমার্টিনে নতুন প্রাণচঞ্চলতা ফিরে আসবে বলে আশাবাদী।