যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ভারতীয় রেস্তোরাঁর পেছনে রহস্যময় শেফ রঞ্জি স্মাইলের গল্প
যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ভারতীয় রেস্তোরাঁর পেছনে রহস্যময় শেফ রঞ্জি স্মাইলের গল্প
যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ভারতীয় রেস্তোরাঁ ১৯০১ সালে নিউইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউতে খুলে, শেফ রঞ্জি স্মাইলের উদ্যোগকে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তবে তার জীবনের উত্থান-পতন, নামের গূঢ়তা ও পরবর্তী বিতর্ক আজও রহস্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে।
১৯০০ সালের শেষের দিকে ভারতীয় খাবারের আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা বাড়ছিল, তবে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ভারতীয় রেস্তোরাঁ ছিল না। লন্ডন থেকে নিউইয়র্কে ১৮৯৯ সালের গ্রীষ্মে পা রাখে রঞ্জি স্মাইল, যাঁর প্রকৃত নাম, জন্মস্থান বা শৈশবের কোনো নথি পাওয়া যায় না। গবেষকরা অনুমান করেন, তৎকালীন ক্রিকেট তারকা কে.এস. রঞ্জিতসিংহের ‘রঞ্জি’ ও ‘ইসমাইল’ নামের ইংরেজি রূপ থেকে ‘স্মাইল’ গ্রহণ করা হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সময় ‘জো’ যুক্ত করে নিজের নাম গড়ে তোলেন।
লন্ডনের সিসিল ও স্যাভয় হোটেলে কারি শেফ হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করার পর স্মাইল নিউইয়র্কে আসে এবং শেরি'স রেস্তোরাঁয় যোগ দেন। মালিক লুই শেরি তার রান্না ও শৈলীর প্রতি মুগ্ধ হয়ে, সিল্কের নীল পাগড়ি ও সাটিনের পোশাক পরে, অতিথিদের সামনে “সাহেব, কারি ঝাল খাবেন, নাকি মৃদু?” জিজ্ঞেস করে পরিবেশন করতেন। তার স্বতন্ত্র স্টাইল দ্রুত শহরের উচ্চবিত্তের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
সেই সাফল্যের পর ১৯০১ সালে শেরি'স ছেড়ে, রঞ্জি স্মাইল নিজস্ব রেস্তোরাঁ ‘ওমর খৈয়াম’ চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। ধনকুবের রোল্যান্ড ও কনকলিনের আর্থিক সহায়তায় নিউইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউতে রেস্টুরেন্টটি উদ্বোধন হয়। রেস্তোরাঁটি ভারতীয় সাজসজ্জা, পাগড়ি পরা পরিবেশক এবং লাইভ সঙ্গীতের মাধ্যমে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা প্রদান করলেও, এক বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের মতে, তখনকার আমেরিকান গ্রাহকদের মধ্যে ভারতীয় খাবারের প্রতি আগ্রহ হ্রাস পেয়েছিল।
রেস্টুরেন্ট বন্ধ হওয়ার পর স্মাইলের জীবন আরও অস্বাভাবিক মোড় নেয়। তিনি নিজেকে বেলুচিস্তানের আমিরের ছেলে ও রাজপুত্র বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং রেস্তোরাঁয় কাজ করানোর জন্য অবৈধভাবে কর্মী আমেরিকায় আনার অভিযোগে আইনি সমস্যার সম্মুখীন হন। নির্বাসনের ঝুঁকি এড়াতে তিনি বিভিন্ন ব্যবসায়িক পরিচয় গ্রহণ করেন, তবে ১৯৩৭ সালে তার এক স্ত্রী বিবাহ বাতিলের আবেদন দাখিল করলে আবার মিডিয়ার দৃষ্টি তার দিকে ফিরে আসে। এরপর থেকে তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
রঞ্জি স্মাইলের উদ্যোগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় খাবারের বিস্তার থেমে না। ১৯১৩ সালে শ্রীলঙ্কার বংশোদ্ভূত কে.ডব্লিউ. কিরা নিউইয়র্কের হারলেমে ‘সিল্ক ইন্ডিয়া ইন’ নামে রেস্তোরাঁ খোলেন, যা কয়েক দশক ধরে সফলভাবে পরিচালিত হয়। আজ যুক্তরাষ্ট্রে হাজারো ভারতীয় রেস্তোরাঁ বিদ্যমান, যদিও রঞ্জি স্মাইলের নাম প্রায়ই ভুলে যায়, তবু তিনি দেশের বাইরে ভারতীয় রান্নার প্রথম অধ্যায় রচনা করেছেন।
সারসংক্ষেপে, রঞ্জি স্মাইলের জীবন নাটকীয়তা, গোপনীয়তা ও বিতর্কে পূর্ণ, তবে তার pioneering উদ্যোগই আজকের বৈচিত্র্যময় আমেরিকান খাদ্য সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করেছে।
মতামত