স্মার্টফোনের স্ক্রিনে দ্রুত আঙুল চলে, সার্চ বারে লেখা হয় কোনো সাম্প্রতিক ঘটনার প্রশ্ন, আর চোখের পলকেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে সম্পূর্ণ সাজানো একটি উত্তর। কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকতে হলো না, কোনো নীল রঙের লিংকে ক্লিকও করতে হলো না। প্রযুক্তি দুনিয়ায় এই নতুন বাস্তবতাকে বলা হচ্ছে ‘জিরো-ক্লিক সার্চ’ (Zero-click Search)। এক দশক আগেও যে সাংবাদিকতা পুরোপুরি দাঁড়িয়ে ছিল সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা ‘এসইও’ (SEO)-র ওপর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি সেই পুরো বাস্তুতন্ত্রকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। এখন আর পাঠকদের মূল ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না; গুগল জেমিনি, চ্যাটজিপিটি কিংবা পারপ্লেক্সিটির মতো এআই ইঞ্জিনগুলো নিজেই খবর প্রক্রিয়াজাত করে সারসংক্ষেপ পরিবেশন করছে।
অনলাইন সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগে কৌশল ছিল সহজ: সার্চ ইঞ্জিনের অ্যালগরিদম বুঝে সঠিক কি-ওয়ার্ড বসানো, যাতে সার্চের প্রথম পাতায় সংবাদমাধ্যমের লিংকটি চলে আসে। পাঠক লিংকে ঢুকবেন, পেজভিউ বাড়বে, আর সেই ট্রাফিকের ওপর ভিত্তি করে আসবে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন থেকে আয়।
তবে এআই চালিত সার্চ ইঞ্জিনগুলো এখন তথ্যের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। ব্যবহারকারী যখন কোনো প্রশ্ন করেন, সার্চের শীর্ষে থাকা ‘এআই ওভারভিউ’ সেকেন্ডের মধ্যে একাধিক নিউজ পোর্টালের তথ্য একীভূত করে উত্তর দিয়ে দেয়। ফলে ব্যবহারকারী তার উত্তর পেয়ে যান সার্চ রেজাল্ট পেজেই। বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল পাবলিশারদের ট্রাফিকের পরিসংখ্যানে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে। সার্চ ইঞ্জিন থেকে সংবাদ পোর্টালগুলোতে পাঠক আসার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে, যা সরাসরি আঘাত হানছে বিজ্ঞাপনী আয়ের ওপর।
এই সংকটের মুখেই জন্ম নিয়েছে নতুন এক ধারণা—জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা ‘জিইও’ (GEO)। এসইও-এর লক্ষ্য যেখানে ছিল সার্চ ইঞ্জিনের র্যাংকিংয়ে ওপরে ওঠা, জিইও-র মূল উদ্দেশ্য হলো এআই জেনারেট করা উত্তরের ভেতরে নিজের সংবাদের তথ্য ও নামকে ‘নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স’ বা সাইটেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
এআই বটগুলো ইন্টারনেটের কোটি কোটি পাতার তথ্য ঘেঁটে কেবল সেই উৎসগুলোকেই অগ্রাধিকার দেয়, যেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা, মৌলিকতা এবং স্বচ্ছতা বেশি। ফলে কেবল কি-ওয়ার্ড দিয়ে ট্রাফিক টানার দিন ফুরিয়ে আসছে। সংবাদটি কে লিখেছেন, লেখকের বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা কতটুকু, এবং তথ্যের প্রাথমিক উৎস স্পষ্ট কি না—এআইয়ের উত্তরের অংশ হতে হলে এসব মানদণ্ড পূরণ করা এখন নিউজরুমগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে উঠছে।
অনলাইন ট্রাফিক কমে যাওয়ার মানে হলো সংবাদমাধ্যমের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন কমে যাওয়া। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টার দিয়ে যে খবর তৈরি করা হয়, এআই কোম্পানিগুলো সেই তথ্য ব্যবহার করে পাঠকদের নিজেদের প্ল্যাটফর্মেই আটকে রাখছে।
এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। অনুমতি ছাড়া এবং কোনো ধরনের রয়্যালটি না দিয়ে সংবাদ দিয়ে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক শীর্ষ গণমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যেই বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছে। অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আবার এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি লাইসেন্সিং চুক্তিতে যাচ্ছে, যাতে তাদের কনটেন্ট ব্যবহারের বিনিময়ে নির্দিষ্ট অর্থ নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু মাঝারি ও স্থানীয় পর্যায়ের নিউজরুমগুলোর জন্য এই লড়াই অনেক বেশি অসম ও কঠিন।
এই প্রযুক্তিক রূপান্তরের মুখে নিউজরুমগুলোকে তাদের কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে:
তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি সংবাদ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে যতটা সহজ ও তাৎক্ষণিক করেছে, ঠিক ততটাই বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে সেই তথ্যের মূল প্রস্তুতকারকদের। এআইয়ের যুগে টিকে থাকতে হলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে কেবল খবর পরিবেশন করলেই চলবে না; তাদের এমন সব মৌলিক কনটেন্ট তৈরি করতে হবে, যা কোনো অ্যালগরিদম নিজে থেকে কখনো তৈরি করতে পারবে না।

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে দ্রুত আঙুল চলে, সার্চ বারে লেখা হয় কোনো সাম্প্রতিক ঘটনার প্রশ্ন, আর চোখের পলকেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে সম্পূর্ণ সাজানো একটি উত্তর। কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকতে হলো না, কোনো নীল রঙের লিংকে ক্লিকও করতে হলো না। প্রযুক্তি দুনিয়ায় এই নতুন বাস্তবতাকে বলা হচ্ছে ‘জিরো-ক্লিক সার্চ’ (Zero-click Search)। এক দশক আগেও যে সাংবাদিকতা পুরোপুরি দাঁড়িয়ে ছিল সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা ‘এসইও’ (SEO)-র ওপর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি সেই পুরো বাস্তুতন্ত্রকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। এখন আর পাঠকদের মূল ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না; গুগল জেমিনি, চ্যাটজিপিটি কিংবা পারপ্লেক্সিটির মতো এআই ইঞ্জিনগুলো নিজেই খবর প্রক্রিয়াজাত করে সারসংক্ষেপ পরিবেশন করছে।
অনলাইন সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগে কৌশল ছিল সহজ: সার্চ ইঞ্জিনের অ্যালগরিদম বুঝে সঠিক কি-ওয়ার্ড বসানো, যাতে সার্চের প্রথম পাতায় সংবাদমাধ্যমের লিংকটি চলে আসে। পাঠক লিংকে ঢুকবেন, পেজভিউ বাড়বে, আর সেই ট্রাফিকের ওপর ভিত্তি করে আসবে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন থেকে আয়।
তবে এআই চালিত সার্চ ইঞ্জিনগুলো এখন তথ্যের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। ব্যবহারকারী যখন কোনো প্রশ্ন করেন, সার্চের শীর্ষে থাকা ‘এআই ওভারভিউ’ সেকেন্ডের মধ্যে একাধিক নিউজ পোর্টালের তথ্য একীভূত করে উত্তর দিয়ে দেয়। ফলে ব্যবহারকারী তার উত্তর পেয়ে যান সার্চ রেজাল্ট পেজেই। বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল পাবলিশারদের ট্রাফিকের পরিসংখ্যানে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে। সার্চ ইঞ্জিন থেকে সংবাদ পোর্টালগুলোতে পাঠক আসার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে, যা সরাসরি আঘাত হানছে বিজ্ঞাপনী আয়ের ওপর।
এই সংকটের মুখেই জন্ম নিয়েছে নতুন এক ধারণা—জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা ‘জিইও’ (GEO)। এসইও-এর লক্ষ্য যেখানে ছিল সার্চ ইঞ্জিনের র্যাংকিংয়ে ওপরে ওঠা, জিইও-র মূল উদ্দেশ্য হলো এআই জেনারেট করা উত্তরের ভেতরে নিজের সংবাদের তথ্য ও নামকে ‘নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স’ বা সাইটেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
এআই বটগুলো ইন্টারনেটের কোটি কোটি পাতার তথ্য ঘেঁটে কেবল সেই উৎসগুলোকেই অগ্রাধিকার দেয়, যেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা, মৌলিকতা এবং স্বচ্ছতা বেশি। ফলে কেবল কি-ওয়ার্ড দিয়ে ট্রাফিক টানার দিন ফুরিয়ে আসছে। সংবাদটি কে লিখেছেন, লেখকের বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা কতটুকু, এবং তথ্যের প্রাথমিক উৎস স্পষ্ট কি না—এআইয়ের উত্তরের অংশ হতে হলে এসব মানদণ্ড পূরণ করা এখন নিউজরুমগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে উঠছে।
অনলাইন ট্রাফিক কমে যাওয়ার মানে হলো সংবাদমাধ্যমের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন কমে যাওয়া। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টার দিয়ে যে খবর তৈরি করা হয়, এআই কোম্পানিগুলো সেই তথ্য ব্যবহার করে পাঠকদের নিজেদের প্ল্যাটফর্মেই আটকে রাখছে।
এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। অনুমতি ছাড়া এবং কোনো ধরনের রয়্যালটি না দিয়ে সংবাদ দিয়ে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক শীর্ষ গণমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যেই বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছে। অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আবার এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি লাইসেন্সিং চুক্তিতে যাচ্ছে, যাতে তাদের কনটেন্ট ব্যবহারের বিনিময়ে নির্দিষ্ট অর্থ নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু মাঝারি ও স্থানীয় পর্যায়ের নিউজরুমগুলোর জন্য এই লড়াই অনেক বেশি অসম ও কঠিন।
এই প্রযুক্তিক রূপান্তরের মুখে নিউজরুমগুলোকে তাদের কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে:
তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি সংবাদ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে যতটা সহজ ও তাৎক্ষণিক করেছে, ঠিক ততটাই বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে সেই তথ্যের মূল প্রস্তুতকারকদের। এআইয়ের যুগে টিকে থাকতে হলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে কেবল খবর পরিবেশন করলেই চলবে না; তাদের এমন সব মৌলিক কনটেন্ট তৈরি করতে হবে, যা কোনো অ্যালগরিদম নিজে থেকে কখনো তৈরি করতে পারবে না।

মতামত