তোরাহ: ইহুদি ধর্মের ১০০০ বছরের নির্দেশনা ও আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা
তোরাহ: ইহুদি ধর্মের ১০০০ বছরের নির্দেশনা ও আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা
ইহুদি ধর্মের মূল পবিত্র গ্রন্থ তোরাহ, যা তিন হাজার বছরেরও বেশি সময়ে ইহুদি সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবন ও আইনকে গঠন করেছে, আজও বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ওয়ান হানড্রেড বুকস দ্যাট চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ডের লেখক ১০০টি কালজয়ী বইয়ের মধ্যে তোরাহকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন; এই তালিকাটি নিয়মিতভাবে নূরুননবী শান্তের অনুবাদে প্রকাশিত হয়। তোরাহ, যা বাংলায় তাওরাত নামেও পরিচিত, ইহুদি পণ্ডিতদের মতে "প্রতিবেশীর তেমনই ভালোবাসো, যেমন তুমি নিজেকে ভালোবাসো"—এই নীতিকে মূলমন্ত্র হিসেবে ধরে রাখে।
তোরাহ পাঁচটি পৃথক গ্রন্থের সমন্বয়ে গঠিত: বেরেশিত, শেমোত, ভায়ইক্রা, বামিদবার এবং দেবারিম। এদের ইংরেজি সমতুল্য হল জেনেসিস, এক্সোডাস, লেভিটিকাস, নাম্বারস এবং ডিউটারোনমি, যা বাইবেলের প্রথম পাঁচটি বইয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই গ্রন্থগুলোতে ইডেন উদ্যানের সৃষ্টিকথা, ইব্রাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবের বংশপরম্পরা, মুসার নেতৃত্বে ইসরায়েলীয়দের মিশর ত্যাগ, সিনাই পর্বতে উপাসনা এবং দশ আদেশসহ বিভিন্ন আইন ও শাস্তির বর্ণনা রয়েছে।
হিব্রু ভাষায় তোরাহ শব্দের অর্থ "আইন" হলেও প্রকৃত অর্থ "নির্দেশনা" বা "শিক্ষা"। ইহুদিরা বিশ্বাস করে, পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বে তোরাহই বিদ্যমান ছিল এবং ঈশ্বর সব জাতির জন্য নাজিল করেছিলেন, তবে কেবল ইসরায়েলই তা গ্রহণ করেছিল। ঐতিহ্য অনুযায়ী মুসা ১৩১২ খ্রিস্টপূর্বে তোরাহ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী ৩০‑৪০ বছরে তা লিখে ফেলেন। আধুনিক গবেষকরা উল্লেখ করেন, এই পাঁচটি গ্রন্থ বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন লেখকের হাতে রচিত হয় এবং খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালের দিকে একত্রে তোরাহ রূপে সংকলিত হয়।
কঠোর ইহুদি সম্প্রদায় তোরাহকে ঈশ্বরের অপরিবর্তনীয় আইন হিসেবে দেখলেও, উদারপন্থী ইহুদিরা এটিকে জীবনের নির্দেশনা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ইসলামও তোরাহর অস্তিত্ব স্বীকার করে, তবে মুসলিমদের মতে সময়ের সাথে সাথে এতে বিকৃতি ঘটেছে। আজও তোরাহ চামড়ার স্ক্রলে হাতে লিখে সংরক্ষণ করা হয়; প্রতিটি হিব্রু অক্ষর—মোট ৩,০৪,৮০৫টি—সঠিকভাবে নকল করতে ১৮ মাসের কঠোর শ্রম ও ক্যালিগ্রাফিক দক্ষতা প্রয়োজন।
ইহুদি ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ইহুদি ব্যক্তির কাছে তোরাহর একটি কপি থাকা বাধ্যতামূলক, এবং কমপক্ষে দুই হাজার বছর ধরে নির্ধারিত বার্ষিক পাঠ্যসূচি অনুসারে তোরাহ বারবার পাঠ করা হয়। তোরাহ শুধুমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, এটি হিন্দুধর্ম ও জরাথুস্ত্রিয়ানের মতো প্রাচীন বিশ্বাসব্যবস্থার সঙ্গে তুলনীয়, যা মানব সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।
সারসংক্ষেপে, তোরাহ ইহুদি ধর্মের আইন, নৈতিকতা ও ইতিহাসের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং আধুনিক বিশ্বে ধর্মীয় সংলাপ, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও নৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে রয়ে গেছে।
মতামত