জিও প্ল্যাটফর্মসের আইপিওতে $৩২ বিলিয়ন সংগ্রহ, শেয়ার ২১% উর্ধ্বে—ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানি!
মুম্বাইয়ের আর্থিক রাজধানীতে ভোরের আলোয় জিও প্ল্যাটফর্মসের আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) শেষমেশ সম্পন্ন হয়েছে। ডিজে পারফরম্যান্স, ড্রোন শো এবং জনপ্রিয় ভারতীয় গায়কদের পরিবেশনা সহ এক ঝলমলে অনুষ্ঠান দিয়ে এশিয়ার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির টেলিকম ও ডিজিটাল সেবা সংস্থা শেয়ারবাজারে প্রবেশ করল।
আইপিও থেকে জিও প্রায় ৩২০ কোটি ডলার (প্রায় $৩২ বিলিয়ন) তহবিল সংগ্রহ করে। তালিকাভুক্তির পর শেয়ারের দাম ২১ শতাংশ বাড়ে, ফলে কোম্পানির বাজারমূল্য $১৩১.৫ বিলিয়ন পৌঁছায়। এই মূল্যায়নে জিও এখন ভারতের সর্বোচ্চ মূল্যবান কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের পরে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করে।
গ্লোবাল টেক জায়ান্ট মেটা ও গুগলও জিওর বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত। ২০২০ সালে উভয় কোম্পানি কয়েকশ কোটি ডলার করে জিওতে বিনিয়োগ করেছিল। বর্তমানে জিওর গ্রাহকসংখ্যা ৫৩ কোটি অতিক্রম করেছে, যা দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
জিওর পরিচালনা পর্ষদের অতিরিক্ত পরিচালক অনন্ত আম্বানি, মুকেশের ছোট ছেলে, অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “জিও হয়তো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভারতের প্রতিটি ডিজিটাল স্বপ্নের সঙ্গে এটি যুক্ত। আজ জিও ভারতের সবার।”
২০১৬ সালে জিও যখন ভারতের টেলিকম বাজারে প্রবেশ করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গিগাবাইট মোবাইল ডেটার গড় দাম প্রায় $৭ ছিল। জিও বিনামূল্যে ডেটা অফার করে বাজারে রেডিক্যাল পরিবর্তন আনে। মাত্র ১৭০ দিনের মধ্যে গ্রাহকসংখ্যা ১০ কোটি পৌঁছায়, যা বিশ্বব্যাপী অদ্বিতীয়। রিলায়েন্সের $২৪৮ বিলিয়ন (প্রায় ২,২৪৮ কোটি ডলার) স্পেকট্রাম, নেটওয়ার্ক ও ফাইবার অবকাঠামোতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি জিওকে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।
শুরুতে লোকসান মেনে গ্রাহকসংখ্যা বাড়ানোর কৌশল গ্রহণের ফলে প্রতিযোগীরা দামের হ্রাসে বাধ্য হয়। ফলে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় প্রথমবারের মতো স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। তিন বছরের মধ্যে জিও দেশের সর্ববৃহৎ টেলিকম অপারেটর হয়ে ওঠে এবং পরে সিনেমা, ক্রীড়া, ক্লাউড স্টোরেজ ইত্যাদি ডিজিটাল সেবা যুক্ত করে ব্যবসার পরিধি বাড়ায়।
জিওর উত্থান টেলিকম সেক্টরে তীব্র মূল্যযুদ্ধের সূচনা করে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত গ্রাহকপ্রতি গড় আয় ৪২.৮% হ্রাস পায়, এবং দশটি প্রধান অপারেটরের মধ্যে সাতটি দেউলিয়া বা একীভূত হয়। বর্তমানে জিও ও এয়ারটেল শক্ত অবস্থানে, আর ভোডাফোন আইডিয়া সহ অন্যান্যরা আর্থিক সংকটে। এই তিনটি কোম্পানি মিলিয়ে ভারতের টেলিকম বাজারের ৯২% শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করে, যা প্রতিযোগিতার হ্রাসের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের জুলাইতে জিও বিভিন্ন প্যাকেজের দাম ১২-২৫% বাড়ায়, এবং অন্যান্য অপারেটরও একই পথে চলেছে। একই সময়ে জিও নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইট (LEO) ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা চালুর পরিকল্পনা প্রকাশ করে, যা ইলন মাস্কের স্টারলিংকের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা গড়ে তুলবে। মাস্ক সম্প্রতি টুইটে অভিযোগ করেন যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার জিওকে সুবিধা দিয়ে স্টারলিংকের প্রবেশ বাধা দিচ্ছে, এবং ‘প্রধানমন্ত্রী আম্বানি’ বলে ব্যঙ্গ করেন। রিলায়েন্সের পক্ষ থেকে জবাবে জানানো হয় যে তারা কখনোই প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়নি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে স্বাগত জানায়।
জিও প্ল্যাটফর্মসের আইপিও এবং তার পরবর্তী কৌশলগুলো শুধু একটি কোম্পানির সাফল্য নয়; এটি ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির পরিবর্তনশীল দিক এবং ভবিষ্যৎ টেলিকম পরিবেশের নতুন দিগন্তের সূচক।