<
করাপশন নিউজ বিডি ২৪
প্রকাশ : রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ সাম্প্রতিককালে ২০৪ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে,

ঋণের মহাসাগর থেকে সরকার কীভাবে বেরিয়ে আসবে?

ঋণের মহাসাগর থেকে সরকার কীভাবে বেরিয়ে আসবে?
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ সাম্প্রতিককালে ২০৪ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে,

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ সাম্প্রতিককালে ২০৪ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা দেশের মোট জিডিপির ৪০ শতাংশেরও বেশি। ঋণের এই বিশাল পরিমাণ সরকারকে আর্থিক সংকটে ডুবিয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়ছে।

শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি প্রধানত বড় মেগা‑প্রকল্পের মাধ্যমে ঘটেছে। ২০০৯ সালে সরকার ক্ষমতায় আসার সময় মোট ঋণ ছিল প্রায় ২.৭৬ লাখ কোটি টাকা; ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ১৮.৩৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে, অর্থাৎ ১৫.৫৮ লাখ কোটি টাকার বিশাল বৃদ্ধি। বর্তমান অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকার ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংযম প্রদর্শন করতে ব্যর্থ, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণে কোনো সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণসেবা (মূলধন ও সুদ) খাতের বরাদ্দ প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের বরাদ্দকে ছুঁয়ে দিয়েছে। ২০২৮-২৯ বাজেট থেকে এই খাত বাজেটের সর্ববৃহৎ ব্যয় হয়ে যাবে, ফলে পাকিস্তানের মতো দেশগুলোই নয়, বাংলাদেশও বারংবার নতুন ঋণ নিতে বাধ্য হবে—এইই ‘ঋণ ফাঁদ’র মূল চিত্র।

নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১১৬ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ২৩ শতাংশের বেশি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতে, বৈদেশিক ঋণ ৪০ শতাংশের ওপর গেলে দেশকে আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলা হয়। যদিও বর্তমান স্তর এখনও নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়, তবে ঋণসেবার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।

বৈদেশিক ঋণের উৎসের বিশ্লেষণ দেখায়: ৩৮% বিশ্বব্যাংক, ২৪.৫% এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ১৭% জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), ৬.৮১% চীন, ৬.১৪% রাশিয়া এবং মাত্র ১.৩% ভারত থেকে এসেছে। অধিকাংশ ঋণ ‘সফট লোন’ হিসেবে নেওয়া হয়েছে, যার সুদের হার কম এবং পরিশোধের মেয়াদ দীর্ঘ।

বাংলাদেশ গত ৫৫ বছরে কখনোই বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। তবে ২০১০‑এর পর ধারাবাহিকভাবে মেগা‑প্রকল্পের নামে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, ঢাকা‑মাওয়া‑ভাঙা রেলপথ, দোহাজারী‑কক্সবাজার রেলপথ ইত্যাদি প্রকল্পের ঘোষিত ব্যয় ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা গেছে; উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা সেতুতে ৩০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলা হলেও প্রকৃত ব্যয় প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকার নিচে, বাকি টাকা লুণ্ঠিত হয়েছে বলে অনুমান।

২০২৩‑২৪ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণসেবার জন্য বাজেটে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছিল; ২০২৬‑২৭ বাজেটে এই পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ছয় বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ধার করা ঋণ বাড়তে থাকলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের ওপরও যেতে পারে।

সরকারের রাজস্বের অনুপাত জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। কয়েক বছর আগে এই অনুপাত প্রায় ১০ শতাংশ ছিল; তবে আওয়ামী লীগ শাসনের শেষ পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়ে এখন এই নিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। রাজস্ব সংগ্রহের ব্যর্থতা ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় একসাথে সরকারি ঋণের চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ড. মইনুল ইসলাম (অবসরপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ) উল্লেখ করেন, স্বৈরশাসনের শেষের পাঁচ বছরে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২৩‑২৪ শতাংশে স্থবির হয়ে গিয়েছিল, আর সরকার জিডিপি বৃদ্ধির কৃত্রিম চিত্র বজায় রাখতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে। এভাবে ঋণ গ্রহণের চক্র অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

বিএনপি সরকার কি ঋণের এই মহাসাগর থেকে দেশকে উদ্ধার করতে পারবে, নাকি আর্থিক সংকটের গভীরতা বাড়বে—এটাই সময়ের পরীক্ষা।

বিষয় : বাংলাদেশ ঋণ বৈদেশিক ঋণ সরকারি ঋণ আর্থিক সংকট বাজেট ঘাটতি ঋণসেবা অর্থনৈতিক উন্নয়ন মেগা প্রকল্প

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

ঋণের মহাসাগর থেকে সরকার কীভাবে বেরিয়ে আসবে?
0:00 0:00
1.0x
করাপশন নিউজ বিডি ২৪

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬


ঋণের মহাসাগর থেকে সরকার কীভাবে বেরিয়ে আসবে?

প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ সাম্প্রতিককালে ২০৪ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা দেশের মোট জিডিপির ৪০ শতাংশেরও বেশি। ঋণের এই বিশাল পরিমাণ সরকারকে আর্থিক সংকটে ডুবিয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়ছে।

শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি প্রধানত বড় মেগা‑প্রকল্পের মাধ্যমে ঘটেছে। ২০০৯ সালে সরকার ক্ষমতায় আসার সময় মোট ঋণ ছিল প্রায় ২.৭৬ লাখ কোটি টাকা; ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ১৮.৩৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে, অর্থাৎ ১৫.৫৮ লাখ কোটি টাকার বিশাল বৃদ্ধি। বর্তমান অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকার ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংযম প্রদর্শন করতে ব্যর্থ, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণে কোনো সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণসেবা (মূলধন ও সুদ) খাতের বরাদ্দ প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের বরাদ্দকে ছুঁয়ে দিয়েছে। ২০২৮-২৯ বাজেট থেকে এই খাত বাজেটের সর্ববৃহৎ ব্যয় হয়ে যাবে, ফলে পাকিস্তানের মতো দেশগুলোই নয়, বাংলাদেশও বারংবার নতুন ঋণ নিতে বাধ্য হবে—এইই ‘ঋণ ফাঁদ’র মূল চিত্র।

নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১১৬ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ২৩ শতাংশের বেশি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতে, বৈদেশিক ঋণ ৪০ শতাংশের ওপর গেলে দেশকে আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলা হয়। যদিও বর্তমান স্তর এখনও নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়, তবে ঋণসেবার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।

বৈদেশিক ঋণের উৎসের বিশ্লেষণ দেখায়: ৩৮% বিশ্বব্যাংক, ২৪.৫% এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ১৭% জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), ৬.৮১% চীন, ৬.১৪% রাশিয়া এবং মাত্র ১.৩% ভারত থেকে এসেছে। অধিকাংশ ঋণ ‘সফট লোন’ হিসেবে নেওয়া হয়েছে, যার সুদের হার কম এবং পরিশোধের মেয়াদ দীর্ঘ।

বাংলাদেশ গত ৫৫ বছরে কখনোই বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। তবে ২০১০‑এর পর ধারাবাহিকভাবে মেগা‑প্রকল্পের নামে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, ঢাকা‑মাওয়া‑ভাঙা রেলপথ, দোহাজারী‑কক্সবাজার রেলপথ ইত্যাদি প্রকল্পের ঘোষিত ব্যয় ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা গেছে; উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা সেতুতে ৩০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলা হলেও প্রকৃত ব্যয় প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকার নিচে, বাকি টাকা লুণ্ঠিত হয়েছে বলে অনুমান।

২০২৩‑২৪ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণসেবার জন্য বাজেটে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছিল; ২০২৬‑২৭ বাজেটে এই পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ছয় বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ধার করা ঋণ বাড়তে থাকলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের ওপরও যেতে পারে।

সরকারের রাজস্বের অনুপাত জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। কয়েক বছর আগে এই অনুপাত প্রায় ১০ শতাংশ ছিল; তবে আওয়ামী লীগ শাসনের শেষ পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়ে এখন এই নিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। রাজস্ব সংগ্রহের ব্যর্থতা ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় একসাথে সরকারি ঋণের চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ড. মইনুল ইসলাম (অবসরপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ) উল্লেখ করেন, স্বৈরশাসনের শেষের পাঁচ বছরে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২৩‑২৪ শতাংশে স্থবির হয়ে গিয়েছিল, আর সরকার জিডিপি বৃদ্ধির কৃত্রিম চিত্র বজায় রাখতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে। এভাবে ঋণ গ্রহণের চক্র অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

বিএনপি সরকার কি ঋণের এই মহাসাগর থেকে দেশকে উদ্ধার করতে পারবে, নাকি আর্থিক সংকটের গভীরতা বাড়বে—এটাই সময়ের পরীক্ষা।


করাপশন নিউজ বিডি ২৪

নির্বাহী সম্পাদক: মাহমুদুর রশিদ । নিউজ এডিটর: ফিরোজ কাদির শাওন । আইন উপদেষ্টা: সিরাজুল ইসলাম অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


যোগাযোগ : 09697716045