<
করাপশন নিউজ বিডি ২৪
প্রকাশ : রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

টাঙ্গাইলের মিঠা পানির মাছের উৎসে সংকট: ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিল্পের হুমকি

টাঙ্গাইলের মিঠা পানির মাছের উৎসে সংকট: ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিল্পের হুমকি
টাঙ্গাইলের মিঠা পানির মাছের উৎসে সংকট: ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিল্পের হুমকি
টাঙ্গাইল জেলায় দেশি মিঠা পানির মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে; জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত। প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংখ্যা বিশাল হলেও, তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলে মোট পুকুরের সংখ্যা ৪১,৪৯৫, আর মুক্ত জলাশয় হিসেবে ২৯৮টি বিল, ১২৮টি খাল, ৩টি বাওড় এবং ৪টি পেন‑কালচার রয়েছে। তবে দ্রুত নগর বিস্তার, শিল্পায়ন ও কৃষিজমির সম্প্রসারণের ফলে এই জলাশয়গুলো পলি‑জমা ও অপ্রতুল রক্ষণাবেক্ষণের শিকার হচ্ছে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কার্তিক মাসের হালকা শীত ও তীব্র রোদে নদ‑নদী, খাল‑বিল ও ডোবা দ্রুত শুকিয়ে যায়, ফলে আটকে থাকা দেশি মাছের প্রজনন চক্র ব্যাহত হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বন্যা ও খরার সংমিশ্রণও মাছের ডিমের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। শীত ও গ্রীষ্মে চাষাবাদের সুবিধার্থে অনেক বিল ও খাল সম্পূর্ণ সেচে পানি নিষ্কাশন করা হয়, যা মা‑মাছের বেঁচে থাকা কঠিন করে দেয়। অতিরিক্ত চাপের আরেকটি দিক হল অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার। কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জাল, মশারি জালের মতো ফাঁদ দিয়ে ডিম‑ওয়ালা মাছ ও রেণু পোনা নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে। ফলে শতাধিক প্রজাতির বর্ণিল দেশি মাছের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে; চিতল, রিটা, গুজি আইড়, বাঘাইড়, বামোশ, রানি, টেংরা, পাবদা, চাপিলা, শিং, মাগুর, দেশি কৈ, খলিসে, ভেদা, ফলি, গজার, চেং, খরকাটি, বালিয়া, চেলা, শাল‑চোপরা, পোয়া ও শৌল ইত্যাদি প্রজাতি চরম সংকটাপন্ন। এই পরিবেশগত অবনতির পরেও কিছু যুবক এখনও বিল ও খালে মাছ ধরার প্রচলন বজায় রেখেছে। কালিহাতি উপজেলার রৌহা গ্রাম থেকে চারজন কিশোর—রিফাত, মাসফিকুর রহমান, মফিরুল ইসলাম ও সেলিম মিয়া—সকাল ৯টায় সেচ শুরু করে দুপুর ১২টায় শেষ করে, পুঁটি, চাটা, টাকি, শিং ও বাইমসহ প্রায় ১০ কেজি মাছ সংগ্রহ করেন। একইভাবে ঘাটাইলের ধলাপাড়া ইউনিয়নের চাপড়া বিলেও রবিন নামের এক কিশোর তার সঙ্গীদের সঙ্গে শোল, টাকি, পুঁটি, খলশে, কৈ, মাগুর, শিং, ট্যাংরা ইত্যাদি দেশি মাছ ধরতে দেখা যায়। মাছের বাজারেও পরিবর্তন স্পষ্ট। মুক্ত জলাশয়ের সুস্বাদু দেশি মাছের অভাবের কারণে দাম বেড়ে গেছে; সাধারণ গ্রাহকদের নাগালের বাইরে দাম চড়ে গেছে। ফলে অধিকাংশ গ্রাহক হাইব্রিড পাঙ্গাস, তেলাপিয়া বা চাষের রুই‑কাতলায় নির্ভর করতে বাধ্য। টাঙ্গাইল জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৩০,৫০০, আর আনুমানিক ২০,০০০ মানুষ পরোক্ষভাবে এই মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ ধরেই জীবিকা অর্জন করেন। তবে জলের স্বাভাবিক পলি‑জমা ও দূষণের কারণে অধিকাংশ মৎস্যজীবী এখন রিকশা চালনা, দিনমজুরি বা অন্যান্য কঠিন শ্রমে নিযুক্ত হচ্ছেন। মাছের সংকট মোকাবিলায় টাঙ্গাইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান কবীর জানান, মৎস্য বিভাগ ইতিমধ্যে জেলায় ১৩টি মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন করেছে, তবে প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার জন্য আরও অভয়াশ্রমের প্রয়োজন। পরিকল্পিত সংস্কার, গভীরতা বৃদ্ধি ও দখল‑দূষণ প্রতিরোধের মাধ্যমে বিল, খাল ও নালার পুনরুদ্ধার জরুরি। এইসব চ্যালেঞ্জের মুখে টাঙ্গাইলের মিঠা পানির মাছের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা শুধুমাত্র মৎস্য বিভাগের দায়িত্ব নয়; স্থানীয় সরকার, পরিবেশ সংস্থা ও সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার, যাতে বাংলার রূপালী জলের স্বাদ ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকে।

বিষয় : টাঙ্গাইল মিঠা পানির মাছ মৎস্য জলবায়ু পরিবর্তন নগরায়ণ জাল পরিবেশ সংরক্ষণ

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

টাঙ্গাইলের মিঠা পানির মাছের উৎসে সংকট: ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিল্পের হুমকি
0:00 0:00
1.0x
করাপশন নিউজ বিডি ২৪

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬


টাঙ্গাইলের মিঠা পানির মাছের উৎসে সংকট: ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিল্পের হুমকি

প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬

featured Image
টাঙ্গাইল জেলায় দেশি মিঠা পানির মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে; জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত। প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংখ্যা বিশাল হলেও, তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলে মোট পুকুরের সংখ্যা ৪১,৪৯৫, আর মুক্ত জলাশয় হিসেবে ২৯৮টি বিল, ১২৮টি খাল, ৩টি বাওড় এবং ৪টি পেন‑কালচার রয়েছে। তবে দ্রুত নগর বিস্তার, শিল্পায়ন ও কৃষিজমির সম্প্রসারণের ফলে এই জলাশয়গুলো পলি‑জমা ও অপ্রতুল রক্ষণাবেক্ষণের শিকার হচ্ছে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কার্তিক মাসের হালকা শীত ও তীব্র রোদে নদ‑নদী, খাল‑বিল ও ডোবা দ্রুত শুকিয়ে যায়, ফলে আটকে থাকা দেশি মাছের প্রজনন চক্র ব্যাহত হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বন্যা ও খরার সংমিশ্রণও মাছের ডিমের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। শীত ও গ্রীষ্মে চাষাবাদের সুবিধার্থে অনেক বিল ও খাল সম্পূর্ণ সেচে পানি নিষ্কাশন করা হয়, যা মা‑মাছের বেঁচে থাকা কঠিন করে দেয়। অতিরিক্ত চাপের আরেকটি দিক হল অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার। কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জাল, মশারি জালের মতো ফাঁদ দিয়ে ডিম‑ওয়ালা মাছ ও রেণু পোনা নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে। ফলে শতাধিক প্রজাতির বর্ণিল দেশি মাছের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে; চিতল, রিটা, গুজি আইড়, বাঘাইড়, বামোশ, রানি, টেংরা, পাবদা, চাপিলা, শিং, মাগুর, দেশি কৈ, খলিসে, ভেদা, ফলি, গজার, চেং, খরকাটি, বালিয়া, চেলা, শাল‑চোপরা, পোয়া ও শৌল ইত্যাদি প্রজাতি চরম সংকটাপন্ন। এই পরিবেশগত অবনতির পরেও কিছু যুবক এখনও বিল ও খালে মাছ ধরার প্রচলন বজায় রেখেছে। কালিহাতি উপজেলার রৌহা গ্রাম থেকে চারজন কিশোর—রিফাত, মাসফিকুর রহমান, মফিরুল ইসলাম ও সেলিম মিয়া—সকাল ৯টায় সেচ শুরু করে দুপুর ১২টায় শেষ করে, পুঁটি, চাটা, টাকি, শিং ও বাইমসহ প্রায় ১০ কেজি মাছ সংগ্রহ করেন। একইভাবে ঘাটাইলের ধলাপাড়া ইউনিয়নের চাপড়া বিলেও রবিন নামের এক কিশোর তার সঙ্গীদের সঙ্গে শোল, টাকি, পুঁটি, খলশে, কৈ, মাগুর, শিং, ট্যাংরা ইত্যাদি দেশি মাছ ধরতে দেখা যায়। মাছের বাজারেও পরিবর্তন স্পষ্ট। মুক্ত জলাশয়ের সুস্বাদু দেশি মাছের অভাবের কারণে দাম বেড়ে গেছে; সাধারণ গ্রাহকদের নাগালের বাইরে দাম চড়ে গেছে। ফলে অধিকাংশ গ্রাহক হাইব্রিড পাঙ্গাস, তেলাপিয়া বা চাষের রুই‑কাতলায় নির্ভর করতে বাধ্য। টাঙ্গাইল জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৩০,৫০০, আর আনুমানিক ২০,০০০ মানুষ পরোক্ষভাবে এই মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ ধরেই জীবিকা অর্জন করেন। তবে জলের স্বাভাবিক পলি‑জমা ও দূষণের কারণে অধিকাংশ মৎস্যজীবী এখন রিকশা চালনা, দিনমজুরি বা অন্যান্য কঠিন শ্রমে নিযুক্ত হচ্ছেন। মাছের সংকট মোকাবিলায় টাঙ্গাইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান কবীর জানান, মৎস্য বিভাগ ইতিমধ্যে জেলায় ১৩টি মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন করেছে, তবে প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার জন্য আরও অভয়াশ্রমের প্রয়োজন। পরিকল্পিত সংস্কার, গভীরতা বৃদ্ধি ও দখল‑দূষণ প্রতিরোধের মাধ্যমে বিল, খাল ও নালার পুনরুদ্ধার জরুরি। এইসব চ্যালেঞ্জের মুখে টাঙ্গাইলের মিঠা পানির মাছের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা শুধুমাত্র মৎস্য বিভাগের দায়িত্ব নয়; স্থানীয় সরকার, পরিবেশ সংস্থা ও সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার, যাতে বাংলার রূপালী জলের স্বাদ ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকে।

করাপশন নিউজ বিডি ২৪

নির্বাহী সম্পাদক: মাহমুদুর রশিদ । নিউজ এডিটর: ফিরোজ কাদির শাওন । আইন উপদেষ্টা: সিরাজুল ইসলাম অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


যোগাযোগ : 09697716045