চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায়: লিউ হাইসিংয়ের গভীর অঙ্গীকার
চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায়: লিউ হাইসিংয়ের গভীর অঙ্গীকার
ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি রাজনৈতিক সংযোগ জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রসার এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিনিময় বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি প্রকাশ করেন।
সেমিনারটি চীনা দূতাবাসের আয়োজনে 'বাংলাদেশ-চীন পলিটিক্যাল পার্টিজ প্লাস' গোলটেবিল বৈঠক ও দলীয়-রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা অধ্যয়ন কেন্দ্রের উদ্বোধন' শীর্ষক আলোচনার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী উপস্থিত ছিলেন, আর অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউইন। উপস্থিতদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ ছিলেন।
লিউ হাইসিং ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে জানান, প্রায় ৪৬ বছর আগে তার বাবা চীনের দ্বিতীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করছিলেন; সেই সময় তিনি শৈশবে ঢাকায় ছিলেন। তিনি বলেন, আজ এখানে ফিরে এসে পুরনো চীনা বন্ধুরা তার বাবাকে গভীর স্নেহের সঙ্গে স্মরণ করছেন, যা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা ও উষ্ণতা, এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের প্রতি সমর্থন তার মনে অমলিন ছাপ ফেলেছে।
লিউ উল্লেখ করেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য গত কয়েক বছরে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তিনি বাংলাদেশকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে, চীনের সহায়তায় নির্মিত মহাসড়ক, সেতু, টানেলসহ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে বলে জোর দেন। ভবিষ্যৎ সহযোগিতার মধ্যে মোংলা বন্দর শিল্প পার্ক এবং তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার উদ্যোগকে প্রধান প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা উভয় দেশের পারস্পরিক লাভ বাড়াবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে লিউ জানান, চীন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমানের পণ্য আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে তার অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করতে চায়, এবং বাংলাদেশ এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে। তিনি চীনের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৩,০০০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং আগামী দশকে এই সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া, মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীকে ৪০ কোটি থেকে ৮০ কোটি পর্যন্ত বাড়ানোর এবং ২০৪৯ সালের মধ্যে আধুনিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পুনর্ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও লিউ চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং দল গঠনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান। তিনি শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা ভিত্তিক দল গঠন বিষয়ক সিপিসি পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের ফলাফল বাংলাদেশে ভাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। লিউ জোর দিয়ে বলেন, সরকার-সরকারে সহযোগিতার বাইরে রাজনৈতিক দল, তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগকে বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাং ও অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের ঐতিহাসিক যাত্রা স্মরণ করে লিউ বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময় দুই দেশের জনগণের মধ্যে সংযোগ গড়ে তুলেছে। তিনি বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের নয়টি সেতুকে দুই দেশের ক্রমবিকাশমান অংশীদারিত্বের দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও একতরফাবাদের প্রেক্ষাপটে লিউ জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করা উচিত। তিনি তরুণ প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্ব সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। 'ইতিহাস আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত এক মূল্যবান বন্ধুত্বের উত্তরাধিকার দিয়েছে' এবং 'বর্তমানকে বুঝতে হলে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হয়'—এই চীনা প্রবাদ উল্লেখ করে তিনি শেষ কথা বলেন।
লিউ হাইসিং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, চীন ও বাংলাদেশ সব সময় একে অপরের পাশে থাকবে এবং বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করবে—এ কথা দিয়ে সেমিনার সমাপ্ত করেন।
মতামত