মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ছক্কার জাদু: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শীর্ষ ৬ স্মরণীয় ইনিংস
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
গ্লেন ম্যাক্সওয়েল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন, তবে তার ছক্কার জাদু ও আক্রমণাত্মক শৈলী এখনও ভক্তদের হৃদয়ে বেঁচে আছে। ‘দ্য বিগ শো’ নামে পরিচিত অজি অলরাউন্ডার তার ক্যারিয়ার জুড়ে ছক্কার ধারায় প্রতিপক্ষের বোলিং লাইনআপকে দুমড়ে-মুচড়ে অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংস গড়ে তুলেছেন। যদিও ৩৮ বছর বয়সে তার শেষ ম্যাচের পরেও কিছুটা আক্ষেপ রয়ে গেছে, তবু ছয়টি চমকপ্রদ পারফরম্যান্স তার অসীম প্রতিভার নিদর্শন হিসেবে রেকর্ডে অম্লান।
প্রথম স্মরণীয় ইনিংসটি ২০২৩ সালের ওডিআই বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখে স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ঘটেছিল। অস্ট্রেলিয়া ২৯২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে মাত্র ৯১ রানে সাতটি উইকেট হারায় এবং টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ার প্রান্তে দাঁড়ায়। প্যাট কামিন্সের সঙ্গে ব্যাটিং পার্টনারশিপে ম্যাক্সওয়েল ১২৮ রান করেন, যার মধ্যে ২১টি চার ও ১০টি ছক্কার মাধ্যমে ২০১ রানের অপরাজিত ডাবল সেঞ্চুরি গড়ে তোলেন। এই ইনিংস অস্ট্রেলিয়াকে সেমিফাইনালে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের পথে এগিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় শীর্ষ পারফরম্যান্সটি ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের টি-টোয়েন্টি ম্যাচে পাল্লেকেলেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঘটেছিল। ইনজুরিতে পড়া অ্যারন ফিঞ্চের অনুপস্থিতিতে ম্যাক্সওয়েল প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টিতে ওপেন করেন এবং রিভার্স সুইপে ছক্কা দিয়ে আক্রমণাত্মক সূচনা করেন। ৬৫ বলের ইনিংসে তিনি ১৪টি চার ও ৯টি ছক্কা মারেন, মোট ১৪৫ রান করে অস্ট্রেলিয়াকে ৩ উইকেটের ক্ষয়ে ২৬৩ রানে শ্রীলঙ্কার রেকর্ড ভাঙা সর্বোচ্চ দলীয় স্কোরে পৌঁছে দেন।
ম্যাক্সওয়েল ছয়জনের মধ্যে একজন যাঁরা সব তিনটি ফরম্যাটে সেঞ্চুরি করেছেন, যদিও তিনি মাত্র সাতটি টেস্ট খেলেছেন এবং তার কোনো সেঞ্চুরি দেশের মাটিতে নয়। ২০১৭ সালে ভারতের রাঁচিতে অনুষ্ঠিত টেস্টে তিনি ১৮৫ বলে ১০৪ রান সংগ্রহ করেন, যার মধ্যে ১৪টি চার ও ১০টি ছক্কার মাধ্যমে একটি দায়িত্বশীল কিন্তু আক্রমণাত্মক ইনিংস গড়ে তোলেন। লাল বলের ক্রিকেটেও তার মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যদিও টেস্টে তার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
তার আন্তর্জাতিক শতকের প্রথম স্বাদ আসে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। মাত্র ৫১ বলে তিনি ১০২ রান করেন, যার মধ্যে ১০টি চার ও ৪টি ছক্কা থাকে। এই ইনিংস তখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ানদের দ্রুততম সেঞ্চুরি এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি রেকর্ড করে, এবং দলকে গুরুত্বপূর্ণ জয় এনে দেয়। এই পারফরম্যান্সের পর তিনি ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপের জয়ী দলের মূল খেলোয়াড় হিসেবে ভূমিকা রাখেন।
২০২৩ বিশ্বকাপের নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে নিউ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ম্যাক্সওয়েল আবারও রেকর্ড ভাঙেন। ৪১তম ওভারের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ৪০ বলে শতক সম্পন্ন করেন, যা পুরুষদের ওডিআই বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম সেঞ্চুরি এবং অস্ট্রেলিয়ার জন্যও দ্রুততম সেঞ্চুরি রেকর্ড। ৪৮তম ওভারে ৪,৪,৬,৬ ছক্কা মারার পর নো-বল ফ্রি-ডেলিভারিতে ফাইন লেগের ওপর হুক করে তিনি তার সেঞ্চুরি সম্পূর্ণ করেন।
শেষ স্মরণীয় ইনিংসটি ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অ্যাডিলেড ওভালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ঘটেছিল। ২৫ বলে হাফসেঞ্চুরি করার পর তিনি একই গতি বজায় রেখে ৫০ বলে শতক স্পর্শ করেন, এবং ৫৫ বলে ৮টি ছক্কা মারার মাধ্যমে ১২০ রান সংগ্রহ করেন। এই পারফরম্যান্সে তিনি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে পঞ্চম সেঞ্চুরি অর্জন করেন এবং রোহিত শর্মারের সঙ্গে যৌথভাবে পুরুষদের টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড গড়ে তোলেন। এটাই ‘দ্য বিগ শো’ গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক শতক।
ম্যাক্সওয়েলের বিদায়ের পরও তার ছক্কা-ছক্কা শৈলী, আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়ে যাবে। তার ছয়টি স্মরণীয় ইনিংস ভবিষ্যৎ ব্যাটসম্যানদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গৌরবময় অধ্যায়ের অংশ হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় থাকবে।
মতামত