<
করাপশন নিউজ বিডি ২৪

ইয়াজুজ-মাজুজের প্রকৃত পরিচয়: কুরআন‑হাদিসে কী বলা আছে?

ইয়াজুজ‑মাজুজের অস্তিত্ব কুরআন ও সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত, তবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন অদ্ভুত কাহিনি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। এই কাহিনিগুলোর সত্যতা, দুর্বলতা এবং ইসরাইলি সূত্র থেকে উদ্ভূত বর্ণনা কী, তা জানার জন্য দরকার কুরআন‑হাদিসের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ। কুরআনের সরাসরি উল্লেখ ইয়াজুজ‑মাজুজের প্রথম উল্লেখ সুরা আল‑কাহফ (আয়াত ৮৩‑৯৮) এবং সুরা আল‑আম্বিয়া (আয়াত ৯৬) এ পাওয়া যায়। আল‑কাহফে যুলকারনাইন নামের এক শাসকের কাছে একটি জনগোষ্ঠী আবেদন করে যে, তারা ইয়াজুজ‑মাজুজের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে একটি শক্তিশালী প্রতিবন্ধক চায়। আল্লাহ তাআলা তার উত্তরে বলেন, "ইয়াজুজ‑মাজুজ পৃথিবীতে মفسিদুন (বিপর্যয়কারী) ..." এবং যুলকারনাইন লোহার বড় বড় খণ্ড গলিয়ে তামা ঢেলে একটি অপ্রবেশ্য প্রাচীর নির্মাণ করেন (আয়াত ৯৪‑৯৭)। একইভাবে আল‑আম্বিয়ায় ভবিষ্যতে ইয়াজুজ‑মাজুজের মুক্তি এবং তাদের ব্যাপক বিস্তার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে (আয়াত ৯৬)। তবে কুরআনে তাদের শারীরিক উচ্চতা, চেহারা বা সংখ্যা সম্পর্কে কোনো বিশদ বর্ণনা নেই। ১২০ হাত উচ্চতা‑সহ অন্যান্য শারীরিক বর্ণনা কিছু তাফসির ও হাদিস গ্রন্থে ইয়াজুজ‑মাজুজকে "একশো বিশ হাত লম্বা" বা "এক থেকে তিন বিঘত" উচ্চতার হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বর্ণনাগুলো মূলত জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.)র আদ‑দুররুল মানসুরে উল্লিখিত এবং সূত্রের মূল রসূল (সা.)‑এর হাদিস হিসেবে স্বীকৃত নয়। ইবনুল জাওজি এবং ইবনু আদি উভয়ই মুহাদ্দিস ইবনে ইসহাক আল‑উক্কাশিকে মুনকার (অবৈধ) হাদিসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাই ১২০ হাত উচ্চতা, কানকে বিছানা করা ইত্যাদি কাহিনিগুলোকে হাদিস হিসেবে গ্রহণ করা বৈধ নয়। ইসরাইলি সূত্রের প্রভাব কাব আল‑আহবার (রহ.)‑এর নামের অধীনে ইসরাইলি বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে ইয়াজুজ‑মাজুজকে তিন ধরনের শারীরিক গঠন দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। কাব আল‑আহবার তাবেই ছিলেন, অর্থাৎ তিনি ইসলাম গ্রহণের আগে ইহুদি ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় যুক্ত ছিলেন। তার বর্ণনা সরাসরি রসূল (সা.)‑এর হাদিস নয়; তাই আলাদা সনদ যাচাই ছাড়া তা গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)‑এর বর্ণনায় ইয়াজুজ‑মাজুজকে "খর্বাকৃতির" এবং উচ্চতা এক‑দুই‑তিন বিঘত বলা হয়েছে, যাও সহিহ হাদিসের তালিকায় নেই। প্রতিদিন প্রাচীর খননের কাহিনি অন্য একটি প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ইয়াজুজ‑মাজুজ প্রতিদিন যুলকারনাইনের তৈরি প্রাচীরের কিছু অংশ খনন করে, কিন্তু তাদের কাজ অদৃশ্য হয়ে যায়। এই কাহিনিটি হজরত আবু হুরায়রা (রা.)‑এর মাধ্যমে ইমাম আহমদ, তিরমিজি ও ইবনে মাজাহের গ্রন্থে উল্লেখ আছে। ইমাম তিরমিজি সনদকে শক্তিশালী বলে উল্লেখ করলেও, মুফাসসির ইবনে কাসির (রহ.) এর বিষয়বস্তুতে অসঙ্গতি দেখিয়ে এটিকে রসূল (সা.)‑এর বক্তব্য হিসেবে গ্রহণের বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, এই কাহিনি সম্ভবত কাব আল‑আহবারের ইসরাইলি সূত্র থেকে আসা এবং ভুলবশত হাদিস হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রাচীরের অংশিক উন্মোচন ও সহিহ হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি বুখারী (৩৩৪৬) ও মুসলিম (২৮৮০) গ্রন্থে হজরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রা.)‑এর বর্ণনা আছে, যেখানে রসূল (সা.) বলেন, "ইয়াজুজ‑মাজুজের প্রাচীরের কিছু অংশ আজই খুলে গেছে"। এখানে কেবল অংশিক উন্মোচনের কথা বলা হয়েছে, পুরোপুরি মুক্তি নয়। তাই কিয়ামতের আগে ইয়াজুজ‑মাজুজের ব্যাপক উন্মোচনের বর্ণনা কুরআন ও সহিহ হাদিসের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ নয়, তবে সম্পূর্ণ মুক্তি সম্পর্কে স্পষ্ট হাদিস নেই। আদম (আ.)‑এর বীর্য থেকে সৃষ্টির কাহিনি কিছু ইসরাইলি উৎসে বলা হয় যে, আদম (আ.)‑এর স্বপ্নদোষের ফলে তার বীর্য মাটিতে মিশে ইয়াজুজ‑মাজুজের সৃষ্টি হয়েছে। এই দাবি কুরআন ও কোনো স্বীকৃত হাদিসে সমর্থিত নয়। ইবনে কাসির (রহ.) এটিকে ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সহিহ হাদিসে ভবিষ্যৎ অবস্থা সহিহ হাদিসে ইয়াজুজ‑মাজুজের শেষ অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা আছে। হজরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.)‑এর বর্ণনা অনুসারে, তাদের প্রথম দল তাবারিয়া হ্রদের পানি পান করে ধ্বংস হবে, এরপর আল্লাহ তাদের ঘাড়ে একধরনের পোকা পাঠিয়ে সমগ্র দলকে মেরে ফেলবে, এবং শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি দিয়ে তাদের দেহ ধ্বংস করা হবে (মুসলিম ২৯৩৭)। এই বর্ণনা তাদের সংখ্যা ও বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়, তবে নির্দিষ্ট উচ্চতা বা শারীরিক গঠন উল্লেখ করে না। উপসংহার ইয়াজুজ‑মাজুজের অস্তিত্ব কুরআন ও সহিহ হাদিসে নিশ্চিত, তবে তাদের শারীরিক গঠন, উচ্চতা, সংখ্যা বা আদমের বীর্য থেকে সৃষ্টির মতো কাহিনিগুলো জাল, দুর্বল বা ইসরাইলি সূত্রের ভিত্তিতে। মুসলমানদের জন্য যথাযথ পদ্ধতি হল কুরআনের স্পষ্ট আয়াত, বুখারী‑মুসলিমের সহিহ হাদিস এবং বিশ্বস্ত মুহাদ্দিসদের বিশ্লেষণকে ভিত্তি করে বিষয়টি গ্রহণ করা। অন্যথায়, কোনো বর্ণনা শোনার আগে তার সনদ ও বিষয়বস্তু যাচাই করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদেরকে সত্যের পথে স্থির রাখুন, আমিন।

ইয়াজুজ-মাজুজের প্রকৃত পরিচয়: কুরআন‑হাদিসে কী বলা আছে?