করাপশন নিউজ বিডি ২৪

কুমেক হাসপাতালে গড়ে দাঁড়িয়েছে গোপন ‘অ্যাম্বুলেন্স দালাল’ জাল

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের প্রাঙ্গণে গোপন ‘অ্যাম্বুলেন্স দালাল’ চক্রের অস্তিত্ব উন্মোচিত হয়েছে, যা রোগী ও স্বজনকে অতিরিক্ত ভাড়া, জবরদস্তি এবং হিংসার শিকার করে। দালালরা রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কার্যক্রম তীব্রতর করে। রোগীকে পছন্দের অ্যাম্বুলেন্সে না নিয়ে গেলে অতিরিক্ত টাকা আদায়, আপত্তি জানালে মারধর ও হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাধারণত ৩,০০০ টাকা ভাড়া নেয়া হয়, তবে দালালরা তা ৮‑১০ হাজার টাকায় বাড়িয়ে দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বললেন, "হাসপাতালের গেটেই কয়েকজন কোলে তুলে সিঁড়ি বেয়ে মেডিসিন ওয়ার্ডে নিয়ে যান, বেড ঠিক করে দেন, ওষুধ এনে দেন—প্রথমে হাসপাতালের লোক ভেবে খুশি হই। পরে বুঝতে পারি তারা দালাল। এক হাজার টাকার ওষুধে পাঁচ হাজার টাকার বিল, পছন্দের অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে হয়, তিন হাজার টাকার ভাড়া দশ হাজারে ঠিক হয়। আমাদের কথার বাইরে গেলে তেড়ে আসেন।" শিশু রোগী পেলে দালালদের আনন্দ দ্বিগুণ হয়। শিশুর স্বজনের আবেগের কারণে তারা দাম নিয়ে দর কষাকষি করে না, ফলে দালালরা দ্রুতই বেসরকারি হাসপাতালে বা ইপিজেডের নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে রোগীকে স্থানান্তর করে, যা রোগীর নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, হাসপাতাল প্রাঙ্গণটি যেন একটি গাড়ি স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে; সিএনজি অটো রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং বিভিন্ন অ্যাম্বুলেন্সের 'মেলা' দেখা যায়। দালালরা বাইরের গাড়ি এলে তা তাড়িয়ে দেয়, এমনকি আনসার (অ্যাম্বুলেন্স রিকশা সেবক) সদস্যদের সামনেও এই কার্যক্রম চলতে থাকে, কিন্তু তাদের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দালালদের বেশিরভাগের বাড়ি নগরীর মুরাদপুরে; উল্লেখযোগ্য নামগুলো হল চর্তার আল আমিন, টুটুল, কাউসার, সোহেল, রাকিব, আকাশ, জহির, সুমন, জিতু, লুলু, ঢুলীপাড়ার জাহাঙ্গীর আলম এবং নুরপুরের দুলাল। অভিযোগ আছে যে হাসপাতালের আনসার সদস্যদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে তারা ক্যাম্পাসে প্রবেশের অনুমতি পায়। কয়েকজন চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মকর্তার মতে, রোগী ও স্বজন সবাই অ্যাম্বুলেন্স, ওষুধ ও ক্লিনিকের দালালদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। স্থানীয় হওয়ায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলে না, ফলে ঝগড়া ও মারামারির ঘটনা প্রতিদিনের মতো ঘটে চলেছে। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, "আমরা চাই রোগীরা স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন। এ জন্য প্রশাসনের সহায়তায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েছি।" তবে কুমিল্লা জেলা অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতারা সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি। কিছু চালক বলছেন, দালালরা কুমেক ক্যাম্পাসকে নিজেদের ঘর বানিয়ে রেখেছে; বাইরের কেউ ভাড়া নিতে চাইলে হয়রানির শিকার হতে হয়। কুমিল্লা এসআরবি ১১, সিপিসি‑২ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাদমান ইবনে আলম উল্লেখ করেছেন, "মেডিকেল কলেজের ওয়ার্ডবয় থেকে অ্যাম্বুলেন্স চালক পর্যন্ত অনেকে দালালি কার্যক্রমে জড়িত। তাদের হাতে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ও স্বজন প্রতারিত হচ্ছেন। শূন্যের কোটায় দালালদের আনা বন্ধ করতে আবারও অভিযান চালানো হবে।" অ্যানসার কমান্ডার মোখলেছুর রহমান জানান, "আমাদের সদস্য ২৭ জন, নিয়মিত ছুটি ও অসুস্থতা থাকায় কম জনবলে এত বড় ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।" আদর্শ সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার সজীব তালুকদারও দালালের উৎপাতের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। হাসপাতালটি বর্হিবিভাগে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার রোগীকে সেবা দেয়; ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১,৫০০, এবং তাদের সঙ্গে অন্তত পাঁচ হাজার স্বজন আসে, যারা মূলত কুমিল্লা ও নোয়াখালীর গ্রামাঞ্চল থেকে। এই বিশাল রোগী প্রবাহের মধ্যে দালাল চক্রের কার্যক্রম রোগীর নিরাপত্তা ও সেবার গুণগত মানকে গুরুতরভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনিক অভিযান, আইনগত পদক্ষেপ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।

কুমেক হাসপাতালে গড়ে দাঁড়িয়েছে গোপন ‘অ্যাম্বুলেন্স দালাল’ জাল