শিয়াল, তক্ষক ও জোঁকের তেল: লোকবিশ্বাসের পেছনের বৈজ্ঞানিক সত্য
শিয়ালের মাংস, তক্ষক এবং জোঁকের তেলকে রোগ‑নিরাময়, যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্যানসার‑মুক্তির আশ্বাস দিয়ে বহু বছর ধরে গ্রাম‑গ্রামেই লোকবিশ্বাসের শিকল বেঁধে আছে। তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞের মন্তব্য দেখায়, এই দাবিগুলোর পেছনে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
শিয়ালের মাংসের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘হাঁপানি, বাত ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাস‑যন্ত্রের রোগে উপশম’ এমন কুসংস্কার প্রচলিত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বিবিসিকে জানান, শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ নেই; এটি খেলে রোগ সেরে যায়—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও একই কথা পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, আধুনিক ফার্মাকোলজি তে শিয়ালের মাংসের কোনো থেরাপিউটিক মূল্য পাওয়া যায় না।
তক্ষকের গুজবও ততটাই বিস্তৃত। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য রোগ নিরাময় এবং যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি করে তক্ষকের দাম কয়েক কোটি টাকার পর্যন্ত বাড়িয়ে বিক্রি করা হয়। তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, তক্ষকের এসব ঔষধি গুণের পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই; মূলত এটি প্রতারণার একটি চক্র। তাছাড়া, চীন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার দেশ থেকে তক্ষকের পাচার কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে তক্ষকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। ড. মনিরুল এইচ খান উল্লেখ করেন, গত সাত‑আট বছর ধরে তক্ষকের গুজব চালু থাকলেও এখন শিকারের প্রবণতা কিছুটা কমেছে।
জোঁকের তেল নিয়ে কথা হলে, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ঐতিহ্যিক চিকিৎসায় নির্দিষ্ট প্রজাতির জোঁক ব্যবহার করা হয়। হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদ বলেন, সব ধরনের জোঁক নয়, শুধুমাত্র মেডিকেটেড জোঁকই থেরাপিউটিক কাজে ব্যবহারযোগ্য। তবে বাজারে প্রচলিত জোঁকের তেল দিয়ে বাত, জয়েন্টের ব্যথা, কোমরব্যথা বা যৌন সমস্যার সমাধান—এই দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মো. আব্দুল মুহিতও জোঁকের তেলের কোনো প্রমাণিত ঔষধি গুণ স্বীকার করেন না।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে শিয়াল ও তক্ষক উভয়ই সংরক্ষিত প্রাণী। অনুমতি ছাড়া শিকার, ধরা, পরিবহন, ক্রয়‑বিক্রয় বা রপ্তানি করা আইনত অপরাধ। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস জানান, শিকারের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করলে বন বিভাগ, পুলিশ, কাস্টমস, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা একত্রে ব্যবস্থা নেবে।
আইইউসিএন ২০১৫ সালের রেড লিস্টে শিয়ালকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং তক্ষককে ‘কম ঝুঁকিতে’ তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল; ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও তক্ষককে ‘লিস্ট কনসার্ন’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে তক্ষক সংগ্রহের বিষয়টি পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, শিয়ালের মাংস, তক্ষক ও জোঁকের তেলকে রোগ‑নিরাময় হিসেবে প্রচার করা কুসংস্কার বৈজ্ঞানিকভাবে অস্বীকৃত, এবং এসব প্রাণীর শিকার আইনি শাস্তি ও পরিবেশগত ক্ষতি উভয়ই বাস্তব উদ্বেগের বিষয়।