প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
ক্ষুধা হ্রাসে অগ্রগতি, নিরাপদ খাবার এখন চ্যালেঞ্জের মুখে
||
খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার; সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়তে পর্যাপ্ত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ খাবার অপরিহার্য। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে উৎপাদন বৃদ্ধি ও ক্ষুধা হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও দারিদ্র্য, মূল্যবৃদ্ধি, অপুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যাগুলি অগ্রগতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি, ফলমূল, মাছ ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমিত জমি ও দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার চাপ সত্ত্বেও উৎপাদন বাড়ানো বড় অর্জন, তবে বাজারে খাবার থাকলেও দরিদ্রের ক্রয়ক্ষমতা না থাকলে ক্ষুধা দূর হয় না। তাই উৎপাদনের পাশাপাশি আয়, কর্মসংস্থান ও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি।
গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী বাংলাদেশ ১২২টি দেশের মধ্যে ৮৪তম স্থানে রয়েছে; ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় অবস্থান ভাল, তবে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় পিছিয়ে। সূচকটি সামগ্রিক ক্ষুধা ও অপুষ্টি নির্দেশ করে, তবে অঞ্চলভিত্তিক পার্থক্য ও শিশু অপুষ্টি, খাদ্যের বৈচিত্র্যের অভাব ইত্যাদি সমস্যার গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ক্ষুধা আরও কমাতে কৃষি উৎপাদনকে টেকসই ও বহুমুখী করতে হবে। ধানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন বাড়াতে হবে, যাতে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আসে এবং আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পায়। কৃষকদের মানসম্মত বীজ, সাশ্রয়ী ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও জলবায়ু‑সহনশীল ফসলের প্রয়োগে ত্বরান্বিত করা জরুরি।
কৃষকের উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্য মূল্য না পেলে তার জীবনমান উন্নত হয় না; মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্বল সরবরাহ শৃঙ্খলা ভোক্তাকে বেশি দামের শিকার করে। সংরক্ষণাগার, হিমাগার, শীতল পরিবহন ও আধুনিক পাইকারি বাজারের উন্নয়নের মাধ্যমে বাজার‑সংযোগ শক্তিশালী করা, মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
খাদ্যের অপচয় রোধ করাও ক্ষুধা কমানোর কার্যকর উপায়। সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণে ক্ষতি কমিয়ে উৎপাদন না বাড়িয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব। কৃষক সমবায়, পারিবারিক কৃষি, ছাদবাগান ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সমর্থন দিয়ে অপচয় কমিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করা যায়।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে লক্ষ্যভিত্তিক করা দরকার। দরিদ্র পরিবার, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা নারী ও দুর্যোগ‑প্রভাবিত জনগোষ্ঠীর কাছে সময়মতো খাদ্য ও নগদ সহায়তা পৌঁছাতে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ, নির্ভুল তথ্যভান্ডার ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
নারীশিক্ষা, নারীর কর্মসংস্থান ও মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি শিশুর পুষ্টি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পুষ্টিকর স্কুল খাবার, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও নারীর সিদ্ধান্তগ্রহণের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে অপুষ্টি হ্রাস করা সম্ভব।
খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ভেজাল, অননুমোদিত রাসায়নিক, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও জীবাণুদূষণসহ বিভিন্ন ঝুঁকি বিদ্যমান। উৎপাদন থেকে টেবিল পর্যন্ত সম্পূর্ণ শৃঙ্খলে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, ফলাফল প্রকাশ ও দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে অনিরাপদ খাবারজনিত রোগে ৮৬ কোটি মানুষ অসুস্থ ও ১৫ লাখেরও বেশি মৃত্যু হয়েছে। যদিও এটি বাংলাদেশের সরাসরি পরিমাপ নয়, তবে খাদ্য নিরাপত্তা না থাকলে চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও মানবসম্পদের ক্ষতি বাড়ে।
দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় ও কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, কৃষি ও মৎস্য অধিদপ্তর, পরিবেশ ও ভোক্তা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব স্পষ্ট করে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের নিয়মিত নমুনা, ফলাফল প্রকাশ ও পুনরাবৃত্ত অপরাধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
অবশেষে, ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ খাবার বেছে নেওয়ার দায় পুরোপুরি ভোক্তার ওপর না দিয়ে সরকারকে নির্ভরযোগ্য তথ্য, সহজলভ্য পরীক্ষাসেবা ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা প্রদান করতে হবে। এ ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপই বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবারের দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে।
নির্বাহী সম্পাদক: মাহমুদুর রশিদ । নিউজ এডিটর: ফিরোজ কাদির শাওন
যোগাযোগ : 09697716045