প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬
এলডিসি উত্তরণকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের ত্বরক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে
||
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)‑এর সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশকে এলডিসি (কমোন্নত দেশের) তালিকা থেকে উত্তরণকে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক বাজারের সুবিধা হারানোর বিষয় হিসেবে না দেখে কাঠামোগত অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
তিনি জোর দিয়ে বলছেন, উত্তরণের সুফল ধরে রাখতে হলে অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা মাত্র নয়, তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে রফতানি বহুমুখীকরণ, তৈরি পোশাক খাতের নতুন সম্ভাবনা ব্যবহার এবং সেবা খাতের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে।
রবিবার ধানমন্ডি সিপিডি কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ : জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে ড. মোস্তাফিজুর রহমান এই মতামত প্রকাশ করেন।
তিনি এলডিসি তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্তির তিনটি প্রচলিত মানদণ্ডের পাশাপাশি একটি জনসংখ্যা সীমা উল্লেখ করেন। ১৯৯১ সালে যুক্ত এই শর্ত অনুসারে কোনো দেশকে এলডিসি হিসেবে স্বীকৃত হতে হলে তার জনসংখ্যা ৭ কোটি ৫০ লাখের বেশি হতে পারবে না; ফলে বাংলাদেশ পুনরায় তালিকায় ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই, যা দেশের নীতিনির্ধারকদের জানার দরকার।
উত্তরণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন প্রতিশ্রুতি তৈরি করবে এবং সঙ্গে অতিরিক্ত চাপও আনবে। ড. মোস্তাফিজুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মেয়াদ শেষ হতে চলেছে; পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অগ্রগতি স্পষ্ট হবে। তাই এখনই প্রস্তুতি ও করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি।
তিনি উল্লেখ করেন, উত্তরণকে শুধুমাত্র অতিরিক্ত তিন বছর বাজার সুবিধা, মেধাস্বত্বের শিথিলতা বা ওষুধ উৎপাদনে বিশেষ সুবিধা হিসেবে না দেখে, ২০২৯ সালের পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার শক্তি কীভাবে বজায় রাখা যায়, সেটিই মূল চ্যালেঞ্জ।
এখন পর্যন্ত আটটি দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করেছে, তাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় এলডিসি; তাই অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিখলেও দেশের বাস্তবতা আলাদা। বড় ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসা, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে উত্তরণ কেবল সুবিধা‑অসুবিধার তালিকা না থেকে পুরো সমাজের সমন্বিত প্রক্রিয়া হতে পারবে না।
গ্লোবাল বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনায় কার্বন নিঃসরণ, শ্রমিক অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন, লিঙ্গ ও পরিবেশগত মানদণ্ডের কমপ্লায়েন্স বাধ্যতামূলক। যদিও এসব শর্তের সরাসরি সম্পর্ক এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে বাংলাদেশকে এগুলো মেনে চলতে হবে।
রফতানি বহুমুখীকরণে তিনি তৈরি পোশাক খাতের বাইরে পণ্যের বৈচিত্র্য আনার সুযোগের কথা উল্লেখ করেন। বিশ্বে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইলের বাজার প্রায় ১,২০০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। ম্যান‑মেড ফাইবার‑ভিত্তিক পোশাকের রফতানি বাড়িয়ে এই বাজারের অংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব। তদুপরি, শ্রম‑ঘন শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি এবং সেবা খাতের, বিশেষ করে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর (সিলভার ইকোনমি) চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
অবশেষে, সিপিডি ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’তে পাঁচটি স্তম্ভ, ৩০টি ক্ষেত্র এবং ১৫৭টি সুনির্দিষ্ট করণীয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো সময়সীমা নির্ধারণ করে বাস্তবায়ন করা এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাহী সম্পাদক: মাহমুদুর রশিদ । নিউজ এডিটর: ফিরোজ কাদির শাওন
যোগাযোগ : 09697716045