প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬
পেরুর নাজকা লাইনস: দুই হাজার বছর পুরনো রহস্যময় ভূচিত্রের সত্য
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
পেরুর শুষ্ক মরুভূমি ও উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকা নাজকা লাইনস, দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো বিশাল জিওগ্লিফ, আজও গবেষকদের মধ্যে নানা তত্ত্বের জন্ম দিচ্ছে।
খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে ৫০০ সালের মধ্যে নাজকা সভ্যতার মানুষ মাটি ও পাহাড়ের ঢালে ৮০০ মাইলেরও বেশি দৈর্ঘ্যের রেখা অঙ্কন করে। এই রেখাগুলোতে মানুষ, প্রাণী, গাছপালা, ফুল এবং জ্যামিতিক নকশা সহ বিভিন্ন রূপ দেখা যায়; মোট নকশার সংখ্যা এখনও সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি, যদিও আধুনিক এআই প্রযুক্তি নতুন নকশা উন্মোচনে সহায়তা করছে।
১৯১০-এর দশকে নাজকা লাইনসের প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু হওয়ার পর থেকে বহু তত্ত্ব উত্থাপিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনা নিভেস বলেন, "রেখাগুলো আকার ও অবস্থানে একে অপরের থেকে ভিন্ন; তাই একক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা কঠিন।" জার্মান গবেষক কার্স্টেন ল্যাম্বার্সও এ কথা যুক্ত করেন যে, ঐ সময়ের কোনো লিখিত বা মৌখিক রেকর্ড না থাকায় সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া চ্যালেঞ্জিং।
প্রাথমিক গবেষণায় দেখা যায়, পাহাড়ের ঢালে অঙ্কিত রেখাগুলো দূর থেকে সহজে দৃশ্যমান, যা সম্ভবত পথনির্দেশক বা ক্যাম্প স্থাপনের স্থান চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হত। পরবর্তীতে এই স্থানগুলো সমাবেশ, উৎসব বা ভোজের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
কিছু পণ্ডিতের মতে, নাজকা লাইনস বৃহৎ ক্যালেন্ডার বা নক্ষত্রের অবস্থান মাপার যন্ত্রের কাজ করতে পারে। ১৯৪১ সালে ইতিহাসবিদ পল কোসোক ও গণিতবিদ মারিয়া রাইখের গবেষণায় এই ধারণা উঠে আসে, তবে আধুনিক গবেষক ক্রিস্টিয়ানে রিখটার উল্লেখ করেন যে মাত্র প্রায় ৮% নকশা চাঁদের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ফলে পুরো লাইনসকে জ্যোতির্বিদ্যাগত ক্যালেন্ডার বলা কঠিন।
উর্বরতা ও আচার-অনুষ্ঠানের দিকেও প্রমাণ পাওয়া যায়। কিছু নকশার কাছে পাথরের নিচু বেদিতে মৃৎপাত্র, ভুট্টা, কাঁকড়া ও ঝিনুকের মতো উপহার রাখা হতো, যা বৃষ্টি ও মাটির উর্বরতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। নিভেসের মতে, একক টানা রেখা দিয়ে তৈরি কিছু লাইন মানুষকে ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা আচারিক পথে চলতে সাহায্য করত।
ড্যারিল উইলকিনসনের মতে, এই বিশাল রেখাগুলোর ওপর দিয়ে একসঙ্গে হাঁটা একটি দলগত কাজ ছিল, যা সেকালের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করত।
যে উদ্দেশ্যেই হোক, নাজকা সভ্যতার মানুষ শুষ্ক পেরু মরুভূমিকে তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও সামাজিক কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তরিত করেছে। আজও এই রহস্যময় ভূচিত্র নতুন গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্ঘাটিত হচ্ছে, যা মানব ইতিহাসের একটি অনন্য অধ্যায় হিসেবে আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।
নির্বাহী সম্পাদক: মাহমুদুর রশিদ । নিউজ এডিটর: ফিরোজ কাদির শাওন
কপিরাইট © ২০২৬ করাপশন নিউজ বিডি ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত