প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
পঞ্চগড়‑কক্সবাজার সরাসরি ট্রেন: রেল মানচিত্রে বিপ্লব
||
দেশের উত্তর সীমান্তের পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণের পর্যটন হাব কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা সরকারকে রেল মানচিত্রের পুনর্গঠনের দিকে ত্বরান্বিত করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে এক ট্রেনে দুই প্রান্তের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ফাঁক পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের নেটওয়ার্ককে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্পকে ত্বরান্বিত করছে। এ প্রকল্পগুলোর মধ্যে ডুয়েলগেজ ও ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ, নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল যাত্রীসেবা এবং পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পঞ্চগড়‑কক্সবাজার সরাসরি ট্রেনের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাঞ্চলের বগুড়া‑সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন, শান্তাহার‑বগুড়া লিংক এবং পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম‑দোহাজারী, টঙ্গী‑আখাউড়া ও লাকসাম‑চট্টগ্রাম রেলপথ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানান, এই সমন্বিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজশাহী, চিলহাটি ও অন্যান্য ব্রডগেজ রুট থেকেও কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।
বর্তমানে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ট্রেনগুলো ঢাকার দিকে যেতে ঈশ্বরদী হয়ে দীর্ঘ ঘুরপথ অতিক্রম করে। বগুড়া‑সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার‑বগুড়া লিংক সম্পন্ন হলে এই ঘুরপথের প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমে যাবে, ফলে পঞ্চগড়, বুড়িমারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও চিলহাটির যাত্রাপথ ছোট হবে এবং তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে। এই সময় সাশ্রয় উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা‑বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে গতিশীলতা আনবে।
বগুড়া‑সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্পের জন্য ইতিমধ্যে ৯০১ একর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এই করিডোরের সঙ্গে শান্তাহার‑বগুড়া লিংক যুক্ত হলে ঢাকা‑পশ্চিমাঞ্চলের ব্রডগেজ সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে এবং উত্তরাঞ্চল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল সংযোগের ভিত্তি দৃঢ় হবে।
পূর্বাঞ্চলের রেলপথ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। চট্টগ্রাম‑দোহাজারী অংশের মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের প্রকল্প ইতিমধ্যে অনুমোদিত এবং ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রস্তুতি চলছে। আখাউড়া‑লাকসাম ডাবল লাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তর সম্পন্ন হয়েছে; এখন টঙ্গী‑আখাউড়া ও লাকসাম‑চট্টগ্রাম অংশকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করলে পূর্বাঞ্চলের নেটওয়ার্কের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
দোহাজারী‑কক্সবাজার রেলপথের ডুয়েলগেজ রূপান্তর সম্পন্ন হওয়ায় পশ্চিমাঞ্চলের ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের ডুয়েলগেজ সংযোগ সম্ভব হয়েছে, যা পঞ্চগড়‑কক্সবাজার সরাসরি ট্রেনের অবকাঠামোগত ভিত্তি আরও মজবুত করেছে।
ঢাকা‑কুমিল্লা কর্ড লাইনও অগ্রাধিকার পেয়েছে। প্রায় ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উঁচু-সেতু ভিত্তিক কর্ড লাইন কুমিল্লাকে শ্যামপুরের সঙ্গে যুক্ত করবে, ফলে ঢাকা‑চট্টগ্রাম দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে যাবে এবং যাত্রা সময় দুই ঘণ্টা হ্রাস পাবে।
নতুন ট্রেন চালুর দিকেও গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। ১০ আগস্ট ঢাকা‑গোপালগঞ্জ‑ঢাকা রুটে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ চালু হয়েছে; ২৬ অক্টোবর রাত ৮টা থেকে মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন ঢাকা‑কক্সবাজার পর্যন্ত চলবে, ফলে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীসহ বিভিন্ন জেলার যাত্রী সরাসরি কক্সবাজারে পৌঁছাতে পারবেন।
রোলিং স্টক সম্প্রসারণে ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচের ক্রয় প্রকল্পের অধীনে প্রথমে ১৮টি কোচ দেশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ১২টি কোচ দিয়ে ঢাকা‑পাবনা‑ঢাকা রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যা নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে চালু হবে। এছাড়া ঢাকা‑খুলনা‑ঢাকা রুটে দুটি আন্তঃনগর ট্রেনের প্রস্তুতিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (AIIB) এর অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল‑ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে, আর এডিবি অর্থায়নে ২০০টি মিটারগেজ কোচ, তিনটি রিলিফ ক্রেন এবং আন্ডার‑ফ্লোর হুইল লেড মেশিনের সংগ্রহের পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়েছে। নতুন আন্ডার‑ফ্লোর হুইল লেড চালু হলে চাকা খুলে না ফেলেই রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হবে, ফলে সময় ও শ্রমের সাশ্রয় হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে ঢাকা‑টঙ্গী‑জয়দেবপুর সেকশনের লেভেল ক্রসিংগুলোকে আন্ডারপাস বা ওভারপাসে রূপান্তরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করা হয়েছে এবং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করা হয়েছে; সফল হলে সারাদেশে এই ব্যবস্থা বিস্তৃত হবে।
ডিজিটাল সেবার দিকেও অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রেলস্টেশনে বিটিসিএলের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওয়াই‑ফাই চালু হয়েছে; পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস ও উপবন এক্সপ্রেসে স্টারলিংকের মাধ্যমে একই সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। রেলওয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পাবলিক‑প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনকে বেসরকারি পরিচালনার জন্য পুনঃদরপত্র আহ্বান এবং রোলিং স্টক উৎপাদন কারখানা স্থাপনের জন্য জমি ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত।
পঞ্চগড়‑কক্সবাজার সরাসরি ট্রেনের উদ্যোগটি রেল যোগাযোগের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্প, ডুয়েলগেজ‑ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ, নতুন রোলিং স্টক, নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সেবা একসাথে বাস্তবায়িত হলে রেলওয়ে আরও সক্ষম, নিরাপদ, আধুনিক ও জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা হয়ে উঠবে।
নির্বাহী সম্পাদক: মাহমুদুর রশিদ । নিউজ এডিটর: ফিরোজ কাদির শাওন
কপিরাইট © ২০২৬ করাপশন নিউজ বিডি ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত